“লটারি নিয়ে প্রশ্নের পাহাড়, রংপুরের গঙ্গাচড়া থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ উপসহকারী প্রকৌশলী”
নুর ইসলাম নোবেল,স্টাফ রিপোর্টার:
নারী কর্মী নিয়োগে লটারি নিয়ে বিতর্ক, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আর ইউনিয়নভেদে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের অভিযোগের মধ্যেই স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. লুৎফর রহমানকে। গত ১ নভেম্বর জারি করা আদেশে তাঁকে বগুড়ার মোকামতলায় বদলি করা হয়। ৩ নভেম্বরের মধ্যে সেখানে যোগদানের নির্দেশনাও দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন ওঠার মধ্যে তাঁর স্ট্যান্ড রিলিজ স্থানীয় পর্যায়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও এ আদেশের সঙ্গে নিয়োগ বিতর্কের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চ্যানেল এস অনলাইনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গত ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর নারী কর্মী নিয়োগের লটারি নিয়ে অসংগতি ও বিতর্কের খবর প্রকাশিত হয়। এর মধ্যেই ১ নভেম্বর আসে লুৎফর রহমানের স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. জেসমিন আক্তার জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যে বগুড়ার মোকামতলায় যোগদান করেছেন।
এলজিইডির পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্পের (আরআরএমপি) আওতায় গঙ্গাচড়ার নয়টি ইউনিয়নে ১০ জন করে নারী কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য ২৬ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে লটারি আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ এই ধাপেই দেখা দেয় চরম পদ্ধতিগত ভিন্নতা। কোথাও ওয়ার্ডভিত্তিক লটারি, কোথাও পুরো ইউনিয়নের আবেদনকারীদের একসঙ্গে নিয়ে কর্মী নির্বাচনের উদ্যোগ। ফলে একই প্রকল্পে আবেদনকারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ছয়টি ইউনিয়নে নারী কর্মী নির্বাচনের লটারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এসব লটারি আয়োজনের সময় উপজেলা প্রকৌশলী জয়া স্যানাল ও উপসহকারী প্রকৌশলী লুৎফর রহমান উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে।
ঘটনার শুরু গত ২৭ অক্টোবর গজঘণ্টা ইউনিয়নে ওয়ার্ডভিত্তিক লটারি আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এরপর ১ নভেম্বর সকালে আলমবিদিতর ইউনিয়ন পরিষদে পুরো ইউনিয়নের আবেদনকারীদের একত্র করে লটারি আয়োজনের উদ্যোগ নেয় এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু এতে আপত্তি জানান উপস্থিত ইউপি সদস্যরা। তাঁদের বাধার মুখে লটারি না করেই ফিরে যান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপসহকারী প্রকৌশলী মামুন মিয়া, কমিউনিটি অর্গানাইজার মো. ফিরোজ মামুন এবং উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মো. পারভেজ মাহমুদ।
কিন্তু একই দিন বিকেলে কোলকোন্দ ইউনিয়নে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সেখানে ইউপি সদস্যদের আপত্তি উপেক্ষা করেই পুরো ইউনিয়নের আবেদনকারীদের একত্র করে লটারি সম্পন্ন করেন এলজিইডির কর্মকর্তারা। সকালে জনপ্রতিনিধিদের বাধায় লটারি বন্ধ, বিকেলে তাঁদের আপত্তি পাশ কাটিয়ে লটারি সম্পন্ন—একই দিনে দুই ইউনিয়নে দুই ধরনের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ জনপ্রতিনিধিরা। তাঁদের প্রশ্ন, নিয়োগের নিয়ম যদি এক হয়, তাহলে বাস্তবায়নে এত ভিন্নতা কেন?
আলমবিদিতর ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম বলেন, একই প্রকল্পের নিয়োগে একেক ইউনিয়নে একেক নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে। কোথাও ওয়ার্ডভিত্তিক লটারি, আবার কোথাও পুরো ইউনিয়নের আবেদনকারীদের একসঙ্গে নিয়ে লটারি করার চেষ্টা চলছে। এতে আবেদনকারীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। সব ইউনিয়নে একই নিয়মে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে কর্মী নির্বাচনের দাবি জানান তিনি।
কোলকোন্দ ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য হুমায়ুন কবির লাল বলেন, তাঁদের ইউনিয়নে ইউপি সদস্যদের আপত্তি থাকার পরও পুরো ইউনিয়নের আবেদনকারীদের নিয়ে লটারি করা হয়েছে। অথচ অন্য ইউনিয়নে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। একই প্রকল্পে একেক ইউনিয়নের জন্য একেক নিয়ম কেন—এ প্রশ্ন তুলে নিয়োগে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
এদিকে লটারি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া উপসহকারী প্রকৌশলী লুৎফর রহমানের বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রকৌশলী জয়া স্যানালের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘স্ট্যান্ড রিলিজ কেন হয়েছে, তা আমি জানি না। হঠাৎ করেই আদেশ এসেছে। তিনি ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. জেসমিন আক্তার বলেন, ‘উপসহকারী প্রকৌশলী লুৎফর রহমানের বদলির বিষয়টি জেনেছি। তিনি ইতিমধ্যে বগুড়ার মোকামতলায় যোগদান করেছেন।’
তবে লটারি আয়োজনের পদ্ধতিতে ভিন্নতা কেন, কোন নিয়মে কর্মী নির্বাচন করা হয়েছে এবং উপসহকারী প্রকৌশলীর স্ট্যান্ড রিলিজের সুনির্দিষ্ট কারণ কী—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। ফলে নারী কর্মী নিয়োগের লটারি ও প্রকৌশলীর স্ট্যান্ড রিলিজ—দুই ঘটনাই ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
Leave a Reply