“পোষ্য কোটা পুনর্বহাল: জাবিতে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, জাকসুর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে”
মো: শাকিল হোসাইন জাবি প্রতিনিধি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে ভর্তির ক্ষেত্রে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ নামে পোষ্য কোটা পুনর্বহালের অভিযোগে আন্দোলনে নেমেছেন একদল শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। বুধবার বেলা ১১টার মধ্যে সিদ্ধান্ত স্থগিত না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা।
পটভূমি: অনশন, সংস্কার, তারপর পুনরায় বিজ্ঞপ্তি
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে ১৪ শিক্ষার্থী পোষ্য কোটাকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে আমরণ গণ-অনশন শুরু করেন। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর উপাচার্যের আশ্বাসে অনশন ভাঙেন তারা। সেদিন রাতেই উপাচার্য জানান, পোষ্য কোটায় ৪০টি আসনে ভর্তি নেওয়া হবে এবং কেবল সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর সন্তানরা এ সুবিধা পাবেন; পাস নম্বর নির্ধারণ করা হয় ৪০ শতাংশ।
৪ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনের এই সংস্কার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবরোধ কর্মসূচি দেন। পোস্টার ছেঁড়া নিয়ে শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে পোষ্য কোটা পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানান। পরে উপাচার্য পোষ্য কোটা সম্পূর্ণ বাতিলের ঘোষণা দেন, তবে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ বহাল থাকবে বলে জানান।
কিন্তু গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’র আওতায় ভর্তির আবেদন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ১–৯ মার্চের মধ্যে অনলাইনে আবেদন ও অফিস প্রধানের প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ঔরসজাত/গর্ভজাত সন্তানরা এ সুবিধার আওতায় বিবেচিত হবে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ: “প্রহসন করে কোটা ফিরিয়ে আনা হয়েছে”
অবস্থান কর্মসূচিতে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাব্বি হাসান বলেন, “প্রশাসন প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার নামে আবার পোষ্য কোটা ফিরিয়ে এনেছে। আমরা এটি মেনে নেব না।”
বাংলা বিভাগের ৫২ ব্যাচের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মহসিন আলী বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা সীমিত। হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এখানে পড়া। সেই জায়গায় বিশেষ সুবিধা দিয়ে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে খর্ব করা হচ্ছে।”
ইংরেজি বিভাগের ৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও জাকসুর কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতি বলেন, “জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিল বৈষম্যমূলক পোষ্য কোটা সম্পূর্ণ বাতিল। আন্দোলনের মুখে তা বন্ধ হলেও পরবর্তীতে হুমকি ও চাপের মধ্যে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ নামে এটি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বুধবার সকাল ১১টার মধ্যে সিদ্ধান্ত স্থগিত না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের ক্যান্টিন বিষয়ক সম্পাদক খন্দকার ফাহাদ বলেন, “পোষ্য কোটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। নাম বদলে একই সুবিধা বহাল রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।”
একাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন, “সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়াই প্রশাসনের চাওয়া হওয়া উচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় সবার, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নয়।”
প্রশাসনের বক্তব্য
কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ও শিক্ষা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’র সিদ্ধান্ত আগেই ছিল; ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা জানানো হয়েছে।
রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভর্তি কমিটির এক সভায় পূর্বের নিয়ম আংশিক সংশোধন করে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগে ভাই, বোন ও স্ত্রী এ সুবিধার আওতায় থাকলেও এখন কেবল সন্তানদের সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
জাকসুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আন্দোলনকারীদের একটি অংশের অভিযোগ, জাকসুর নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের অঙ্গীকার থাকলেও পোষ্য কোটা প্রশ্নে সংগঠনের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত প্রতিনিধিত্বমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জাকসুর আরও দৃশ্যমান ও দৃঢ় ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল।
এদিকে আন্দোলনকারীরা বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়ে জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত স্থগিত না হলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবেন। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই এখন নজর বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সবার।
Leave a Reply