“জাবিতে সাবেক শিক্ষার্থী তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ, ৯৯৯-এ ফোনে উদ্ধার ছাত্রী”
মো: শাকিল হোসাইন জাবি প্রতিনিধি :
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে হলের সামনে থেকে প্রলুব্ধ করে বাসায় নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে এবং পরে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে ক্যাম্পাসে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্তের পরিচয় ও পটভূমি-
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত তারিকুল ইসলাম Institute of Information Technology, Jahangirnagar University (আইআইটি)-এর ৪৪তম আবর্তনের সাবেক শিক্ষার্থী। তার বাড়ি জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলায়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার বাবার নাম আব্দুর রশিদ।
তবে অভিযুক্তের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত-
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে তার বিভাগের এক নারী শিক্ষক জানান, অভিযুক্তের সঙ্গে ওই ছাত্রীর পূর্বে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল, যা পরবর্তীতে ভেঙে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর হলের সামনে গিয়ে জোরপূর্বক যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং ‘শেষ কথা’ বলার কথা বলে বাসায় যাওয়ার জন্য চাপ দেন।
ভুক্তভোগী রাজি না হলে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হয় বলে অভিযোগ। পরে পরিস্থিতির চাপে ইফতার সামগ্রী কেনার অজুহাতে অভিযুক্তের বাসায় যান ভুক্তভোগী।
বাসায় নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ-
অভিযোগ অনুযায়ী, বাসায় নেওয়ার পর ভুক্তভোগীর মুখ টেপ দিয়ে আটকে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে তার হাতে গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়। এতে তার হাতের ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার অংশ দগ্ধ হয়।
এরপর অভিযুক্ত ক্ষতের ওষুধ কিনতে যাওয়ার কথা বলে রুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে বের হয়ে যান। এই সুযোগে ভুক্তভোগী জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে সাহায্য চান।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।
চিকিৎসকের বক্তব্য-
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. তানভীর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন,
“পুলিশ ভুক্তভোগীকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে। তার হাতে ৩–৪ সেন্টিমিটার জায়গা পুড়ে গেছে। আমাদের এখানে প্রয়োজনীয় বার্ন চিকিৎসা না থাকায় তাকে সাভারে রেফার করা হয়েছে।”
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের ভূমিকা-
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
Mir Mosharraf Hossain Hall-সংলগ্ন এলাকাসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করছেন, অতীতে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনায় যথাযথ শাস্তির অভাবেই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তারা দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
আইনগত অগ্রগতি-
আশুলিয়া থানা পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থল, কল রেকর্ড ও প্রাথমিক মেডিকেল রিপোর্ট যাচাই করা হচ্ছে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট-
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রশ্নে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। নিরাপত্তা ক্যামেরা বৃদ্ধি, হল এলাকায় টহল জোরদার এবং বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের।
শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল প্রশাসনিক নজরদারি নয়, সম্পর্কভিত্তিক সহিংসতা (relationship-based violence) সম্পর্কে সচেতনতা ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি।
এই ঘটনায় আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও কার্যকর নিরাপত্তা নীতি ছাড়া এমন ঘটনা থামানো সম্ভব নয়।
এদিকে ভুক্তভোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি কামনা করে দ্রুত বিচার ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার দাবি জানানো হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে।
Leave a Reply