“আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও লালপুরের গোসাই আশ্রম দখল চেষ্টার অভিযোগ”
“লালপুর(নাটোর)প্রতিনিধি”
নাটোরের লালপুরে প্রায় দুই শতাব্দীর প্রাচীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ‘শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোসাই সৎসঙ্গ সেবা আশ্রম’-এর সম্পত্তি ও পরিচালনা কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে ফের চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আদালতের চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আশ্রমের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা, বর্তমান প্রধান সেবাইতকে প্রাণনাশের হুমকি ও বাগানের আম পাড়তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি মহলের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে লালপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন আশ্রমের প্রধান সেবাইত।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এই কমিটি গঠন ও আশ্রমের দখল নিয়ে বিরোধের ইতিহাস বেশ পুরনো; এর আগে গতবছর একই ঘটনায় আশ্রম কমিটির সভাপতিকে মারধর ও আম পাড়াকে কেন্দ্র করে গুলিবর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটেছিল।
আশ্রমের ভক্ত ও স্থানীয় সুধীমহল জানায়, রামকৃষ্ণপুর (নওপাড়া) গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক আশ্রমটির পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। গত বছরের ১৯ মার্চ এই বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও
আশ্রম পরিচালনা কমিটির সভাপতি শ্রী সঞ্জয় কুমার কর্মকার ও কমিটির অন্যান্য সদস্যরা গুরুতর আহত হন। এছাড়াও গত বছরের ২০ মে গোসাই আশ্রমে নওপাড়া গ্রামের নাসির ও তার অনুসারীরা আশ্রমের বাগানের ক্রয়কৃত আম পাড়তে গেলে প্রতিপক্ষ মিল্টন বাধা দেয়। এসময় উভয়পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে মিল্টনের অনুসারীরা দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ ঘটনাস্থলে এসে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। গুলির শব্দে আশপাশের লোকজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উক্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনায় লালপুর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয় যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
মামলার নথি ও ডিক্রি সূত্রে জানা যায়, আশ্রমের সম্পত্তি ও ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষায় ইতিপূর্বে সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা নং-১১৯/৮৮ এবং ২৬৭/১২ দায়ের করা হয়েছিল। উক্ত মামলায় আদালত বিবাদীদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ (ডিগ্রি) প্রদান করেন, যাতে তারা আশ্রমের ধর্মীয় কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি বা হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও পুরনো মামলা সচল থাকা সত্ত্বেও গত ১৫ মে ২০২৬ সকালে আশ্রম চত্বরের ভেতরের বাগান থেকে আম পাড়তে গেলে বিবাদী পক্ষ পুনরায় চড়াও হয়। লালপুর থানায় দায়েরকৃত সর্বশেষ জিডি সূত্রে জানা গেছে, আশ্রমের সভাপতির সঞ্জয়ের ওপর হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি শ্রী উত্তম মন্ডল মাস্টার (৪৫) সহ তার অনুসারীরা আশ্রমে প্রবেশ করে আম পাড়তে বাধা দেয় এবং আশ্রমের আম বাগান বিক্রয়ের টাকা দাবি করে। এতে অসম্মতি জানালে তারা বর্তমান প্রধান সেবাইত শ্রী চিন্মন্ত চন্দ্র রায়কে (৫৬) গালিগালাজ এবং আশ্রম থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।
এবিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত উত্তম মন্ডল বলেন ওখানে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আছে আমরা তার বিরুদ্ধে আপিল করেছি সামনে শুনানির ডেট আছে এবং আমরা আদালতে জবানবন্দী দিয়ে আশ্রম পরিচালনা করছি।
এবিষয়ে আশ্রমের প্রধান সেবাইত শ্রী চিমন্ত চন্দ্র রায় বলেন, “বিবাদী পক্ষ এর আগেও আমাদের কমিটির সভাপতিকে মারধর করেছে, আশ্রমে গুলিবর্ষণ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা রয়েছে। এখন আবার আদালতের চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আমাদের বাগানের আম পাড়তে দিচ্ছে না, উল্টো আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করার হুমকি দিচ্ছে। আমরা সাধু-সন্ন্যাসীরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
বর্তমান আশ্রম কমিটির সভাপতি সঞ্জয় কুমার কর্মকার জানান, গোসাঁই আশ্রমের সমস্ত সম্পত্তি আশ্রমের রেকর্ডি ও নিজস্ব সম্পত্তি এখানে সবাইত অনুমোদিত কমিটি ব্যতীত যে কেউ এসে দখল বা হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে না।
তিনি আরও বিজ্ঞ আদালতের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং মামলা চলমান অবস্থায় উত্তম কুমার মন্ডল বিভিন্ন সময়ে এসে বর্তমান কমিটিকে কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা প্রদানসহ আশ্রমের সেবাইতকে হুমকি এবং আশ্রম দখলের চেষ্টা করছেন।
এই বিষয়ে লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, “সেবাইতকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে একটি জিডি করা হয়েছে, এবিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি গোসাই আশ্রম একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এটাকে কেন্দ্র করে এলাকার আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটে এরকম কোন ঘটনা কাম্য নয়।
Leave a Reply