“সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বর্তমান রূপ”
জেলা প্রতিনিধি সাতক্ষীরা: মেহেদী হাসান
দক্ষিণবঙ্গের প্রাচীন জনপদ সাতক্ষীরার সংস্কৃতির সবচেয়ে বর্ণিল ও আকর্ষণীয় অধ্যায় হলো ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা। প্রায় তিনশ থেকে চারশ বছরের পুরোনো এই মেলাটি কেবল একটি কেনাবেচার হাট নয়, এটি সাতক্ষীরাবাসীর প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের মিলনমেলায় রূপ নেয় এই মেলা।
সূচনার ইতিহাস ও নামকরণের প্রেক্ষাপট
বাংলা সনের ভাদ্র মাসের শেষ দিনে (সাধারণত ৩১ ভাদ্র) সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে এই মেলার উৎপত্তি হয়। গুড়পুকুর নামকরণের পেছনে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত জনশ্রুতি হলো—শহরের পলাশপোল এলাকার একটি পুকুরপাড়ে এক ক্লান্ত পথিকের গায়ে সাপ ফণা তুলে ছায়া দিয়েছিল। এ ঘটনার পর সেখানে মনসা পূজা শুরু হয় এবং পূজার মিষ্টি প্রসাদ পুকুরে ফেলায় পুকুরের পানি মিষ্টি হয়ে যায়। আবার অনেকের মতে, পুকুরটিতে পানি না থাকায় স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে ১০০ ভাড় গুড় ঢেলে পুকুরটি সংস্কার করা হয়েছিল, যে কারণে এর নাম হয় ‘গুড়পুকুর’। অন্যদিকে ঐতিহাসিকদের মতে, চৌধুরীপাড়ার গৌরবর্ণের রায় চৌধুরীদের পুকুর নামের বিবর্তনে ‘গৌরদের পুকুর’ থেকে আজকের ‘গুড়পুকুর’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
মেলার মূল আকর্ষণ ও পসরা
সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল স্কুল মাঠ এবং এর আশপাশের এলাক জুড়ে এই মেলা বসে। বাংলার আবহমান আমলের গ্রাম্য মেলার ঐতিহ্য ধারণ করে এই মেলায় হরেক রকমের পণ্যের সমাহার ঘটে:
গাছগাছালি ও চারা: এ মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো সাতক্ষীরার বিখ্যাত নানা প্রজাতির কলম করা ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা।
কুটির শিল্প ও গৃহস্থালি সামগ্রী: কাঠ, মাটি, বাঁশ, বেত ও লোহা দিয়ে তৈরি কুটির শিল্পের নানা প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন—কুলা, ঝুড়ি, দা, কুঠার, ও কোদাল।
খেলনা ও প্রসাধন: শিশুদের বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী খেলনা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা স্টেশনারি পণ্যের দোকান।
বিনোদনের মাধ্যম: গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ ও গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির নানা পরিবেশনা থাকে।
সংকট ও সংগ্রামের ইতিহাস
দীর্ঘ ঐতিহ্যের এই মেলা তার পথচলায় বেশ কিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হয়েছে। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মেলার একটি সার্কাস প্যান্ডেল ও সিনেমা হলে মর্মান্তিক বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এই দুঃখজনক ঘটনার পর প্রায় দীর্ঘ ছয় থেকে আট বছর নিরাপত্তা ও আইনি জটিলতার কারণে মেলা বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে এবং সর্বস্তরের মানুষের সহায়তায় মেলাটি আবার তার প্রাণ ফিরে পায়। বর্তমান সময়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে মেলায় জুয়া, হাউজি ও অশ্লীলতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে এটি একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিবারবান্ধব উৎসবে রূপ নিয়েছে।
উপসংহার
ডিজিটাল যুগেও সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলা তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা ধরে রেখে টিকে আছে। এটি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সাতক্ষীরার ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে শেকড়ের পরিচয় তুলে ধরতে এই মেলার গুরুত্ব অপরিসীম
Leave a Reply