এইচএসসি ফলাফল: ব্যর্থ কারা—শিক্ষার্থী, নাকি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা?
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। এ বছর পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন। পরিসংখ্যানটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ফলাফল কি কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি, নাকি এর ভেতরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকটও দৃশ্যমান হচ্ছে?
একটি পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে কোনো প্রজন্মের মেধা, যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। অথচ ফল প্রকাশের পর প্রায় প্রতিবারই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমের প্রশ্ন। এবারের ফলাফলও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু পরিসংখ্যান একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
২০২৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে। এবার আরও কমে হয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। একইভাবে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও নাটকীয়ভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৬৯ হাজার ৯৭-এ। ২০২৬ সালে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে।
অবশ্যই ভালো ফল মানেই ভালো শিক্ষা নয়, আবার খারাপ ফল মানেই শিক্ষার্থীরা খারাপ—এমন সমীকরণও গ্রহণযোগ্য নয়। বরং ফলাফলের এই বড় ওঠানামা আমাদের মূল্যায়ন পদ্ধতি, পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বিশেষ করে এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। অনলাইন শিক্ষা সর্বত্র সমানভাবে কার্যকর হয়নি। এরপর বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা ও একাডেমিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে একটি বড় অংশের শিক্ষার্থীর শেখার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।
প্রশ্ন হলো—সেই ক্ষতি পূরণে আমরা কী করেছি?
শুধু পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, নাকি শিক্ষার্থীরা আদৌ যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করার কথা ছিল, তা অর্জন করতে পেরেছে কি না—সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে?
এখানে মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রসঙ্গও সামনে আসে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষণের পর ৫৬ হাজারের বেশি খাতায় নম্বর পরিবর্তনের ঘটনা এবং ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থীর ফেল থেকে পাস করার তথ্য আমাদের ভাবায়। এটি এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে কোনো নির্দিষ্ট অনিয়মের প্রমাণ নয়—এ কথা স্পষ্ট রাখা দরকার। কিন্তু একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয়, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা ও সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি নম্বর কখনো কখনো একজন শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের দরজা খুলে দিতে পারে, আবার বন্ধও করে দিতে পারে।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমাদের মূল্যায়ন ব্যবস্থা কতটা নির্ভুল? পরীক্ষকরা কি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা পাচ্ছেন? বিভিন্ন বোর্ডে মূল্যায়নের মানদণ্ড কি যথেষ্ট অভিন্ন? একই মানের উত্তর কি ভিন্ন পরীক্ষকের হাতে ভিন্ন নম্বর পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে, আবেগ দিয়ে নয়।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হলে দায় সাধারণত শিক্ষার্থীর ওপর বর্তায়। কিন্তু একটি শিক্ষা ব্যবস্থার ফলাফল আসলে বহু উপাদানের সম্মিলিত ফল—শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতির। সুতরাং ফল খারাপ হলে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বরং প্রয়োজন ফলাফলের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।
কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে? কোন বোর্ডে ফল সবচেয়ে বেশি কমেছে? শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্য কতটা? সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফলাফলে কী ধরনের ব্যবধান রয়েছে? শিক্ষক-সংকট, অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি এবং শেখার ঘাটতির সঙ্গে ফলাফলের সম্পর্ক কী? এসব প্রশ্নের উত্তর বের না করলে আমরা কেবল ফলাফল প্রকাশ করব, কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত অবস্থা জানতে পারব না।
এবারের ফলাফলকে তাই শুধু ‘ফল বিপর্যয়’ বলে আলোচনা শেষ করে দেওয়া উচিত নয়। এটি হতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট—যা আমাদের কোথায় সমস্যা, তা খুঁজে বের করার সুযোগ করে দিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যারা এবার অকৃতকার্য হয়েছে তাদের আমরা কীভাবে দেখি।
একটি পরীক্ষায় ফেল করা মানে একজন শিক্ষার্থী ব্যর্থ মানুষ—এ ধারণা শুধু নিষ্ঠুরই নয়, শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও অযৌক্তিক। তাদের শেখার ঘাটতি কোথায়, কেন তারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারেনি এবং কীভাবে তাদের পুনরায় প্রস্তুত করা যায়—সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। তাদের জন্য কার্যকর পুনঃশিক্ষণ, মানসিক সহায়তা এবং পরবর্তী সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু বেশি পাস করানো নয়। আবার কম পাস করানোও শিক্ষার মান উন্নয়নের স্বয়ংক্রিয় প্রমাণ নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত—শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কতটা বুঝছে এবং সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে কি না।
সুতরাং এবারের এইচএসসি ফলাফল আমাদের জন্য অস্বস্তিকর হলেও এটি একটি প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা।
থার্মোমিটারে যদি জ্বর ধরা পড়ে, থার্মোমিটার ভেঙে ফেললে জ্বর কমে না।
তেমনি ফলাফলকে অস্বস্তিকর মনে করে শুধু পাসের হার বাড়ানোর পথ খুঁজলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের খুঁজতে হবে রোগের কারণ। শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি কোথায়, শিক্ষকতা ও মূল্যায়নে কোথায় দুর্বলতা, পাঠ্যক্রমে কী পরিবর্তন দরকার এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়—সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
কারণ এবারের ফলাফলে শুধু শিক্ষার্থীদের নম্বর কমেনি; আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার জায়গাতেও প্রশ্ন উঠেছে।
এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি এই ফলাফলকে শুধু একটি ‘খারাপ রেজা
Leave a Reply