“প্রত্যন্ত পাহাড় থেকে সিঙ্গাপুর,শুভ্রদেব ত্রিপুরার সাফল্যের গল্প”
খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
সংগ্রাম, প্রার্থনা ও অধ্যবসায়ে Master of Pastoral Ministry ডিগ্রি অর্জন
স্বপ্নের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, প্রত্যন্ত জনপদের সীমিত সুযোগ কিংবা জীবনের নানা প্রতিকূলতা,কোনোটিই যদি স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে না পারে, তবে একদিন সেই স্বপ্নই মানুষকে নিয়ে যেতে পারে বহু দূরের গন্তব্যে।
মাটিরাঙ্গার তবলছড়িতে জন্ম। শৈশবের একপর্যায়ে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ৫ নম্বর ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের গাছবান এলাকায়। পাহাড়ের সবুজ-নীরব পরিবেশে বেড়ে ওঠা সেই শিশুটিই ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন শিক্ষার দীর্ঘ পথে। স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে কলেজ, এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ,আর শেষ পর্যন্ত দেশের সীমানা পেরিয়ে সিঙ্গাপুরের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
তিনি খাগড়াছড়ির কৃতি সন্তান অ্যাডভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরা সাইমন। দীর্ঘদিনের প্রার্থনা, ত্যাগ, অধ্যবসায় এবং নানা আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তিনি সিঙ্গাপুরের Piedmont College of Theology থেকে অর্জন করেছেন Master of Pastoral Ministry (MPM) ডিগ্রি। এ অর্জন শুধু একটি একাডেমিক ডিগ্রি নয়; প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ থেকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার পরিসরে পৌঁছে যাওয়ার এক দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি। একই সঙ্গে এটি পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য স্বপ্ন দেখার ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।
তবলছড়ির মাটি থেকে গাছবানের পথে:
শ্যামা চরণ ত্রিপুরা ও বিশ্বকুমারী ত্রিপুরা দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান শুভ্রদেব ত্রিপুরা।
তাঁর জন্ম মাটিরাঙ্গার তবলছড়িতে। পরে পরিবারের সঙ্গে তিনি চলে আসেন খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ৫ নম্বর ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের গাছবান এলাকায়। এখানেই পরিবারের স্নেহ, পাহাড়ি জনপদের প্রকৃতি আর আপন পরিবেশের মধ্যে তাঁর বেড়ে ওঠা। সেই গাছবান থেকেই শুরু হয় তাঁর শিক্ষার পথচলা।
শিক্ষার প্রথম পাঠ নেন যামিনী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মোহন্ত কারবারি পাড়া সরকারি স্কুলে। এরপর তবলছড়ি কদমতলি উচ্চ বিদ্যালয় এবং মুনিগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদের সেই শিক্ষাজীবন হয়তো ছিল সাধারণ; কিন্তু স্বপ্নটি ছিল অসাধারণ। ধীরে ধীরে সেই স্বপ্নের পরিধি বাড়তে থাকে। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পৌঁছে যান উচ্চশিক্ষার বৃহত্তর পরিসরে।
গাছবান থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। ২০০২-২০০৩ শিক্ষাবর্ষে আইন বিষয়ে এলএলবি (সম্মান) ও এলএলএম (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন তিনি।
আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে আইন পেশাকে জীবনের অন্যতম কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন শুভ্রদেব। তবে তাঁর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ থেমে থাকেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ আরও বিস্তৃত হয়েছে।
জীবনের এক পর্যায়ে সেই শিক্ষার পথই তাঁকে নিয়ে যায় দেশের সীমানার বাইরে,সিঙ্গাপুরে।
সিঙ্গাপুরে নতুন অধ্যায়:
উচ্চশিক্ষার এই অধ্যায় তাঁর জন্য সহজ ছিল না। প্রার্থনা, ত্যাগ, অধ্যবসায় এবং নানা আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তিনি সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা চালিয়ে যান।
সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত ও ব্যয়বহুল দেশে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা সম্পন্ন করে Master of Pastoral Ministry ডিগ্রি অর্জন তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
পাহাড়ের মাটিতে যার শিক্ষাজীবনের শুরু, তাঁর শিক্ষাযাত্রা শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার আঙিনায়। পথটি দীর্ঘ ছিল, কিন্তু প্রতিটি ধাপেই ছিল এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।
অ্যাডভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরার ভাষ্য, তাঁর জানা মতে বাংলাদেশের ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে Pastoral Ministry বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারীদের মধ্যে তিনি একজন এবং সম্ভবত প্রথমদের একজন।
‘এই অর্জন শুধু আমার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়’
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে অ্যাডভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরা বলেন, “এই অর্জন শুধু আমার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি আমার সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। আমি এই শিক্ষা মানবসেবা ও সমাজের কল্যাণে কাজে লাগাতে চাই।”
তাঁর কাছে শিক্ষা শুধু নিজের পরিচয়কে সমৃদ্ধ করার বিষয় নয়; অর্জিত জ্ঞান মানুষের কাজে লাগানোই এর প্রকৃত সার্থকতা। তিনি বলেন, অর্জিত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে মানবসেবা, সমাজের কল্যাণ এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
সাফল্যের আড়ালে যে দীর্ঘ পথ:
একটি ডিগ্রির পেছনে কখনো শুধু পরীক্ষার ফল থাকে না; থাকে অপেক্ষা, ত্যাগ, উদ্বেগ, প্রার্থনা এবং অসংখ্য মানুষের নিঃশব্দ সহযোগিতা।
শুভ্রদেবের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে নানা আর্থিক ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ। তবু থেমে যাননি। এক ধাপ পেরিয়ে আরেক ধাপ,এভাবেই এগিয়ে গেছেন লক্ষ্যের দিকে।
তাঁর এই পথচলায় পরিবারের পাশাপাশি যাঁরা প্রার্থনা, ভালোবাসা, উৎসাহ এবং আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শুভ্রদেব জানান, দীর্ঘ পথচলায় মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে।
শিক্ষা, পেশা ও সমাজের সঙ্গে পথচলা:
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও পেশাগত ক্ষেত্রেও সক্রিয় শুভ্রদেব ত্রিপুরা। বর্তমানে তিনি ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সাধারণ সম্পাদক, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক এবং খাগড়াছড়ি জেলা আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আইন পেশা, সামাজিক দায়িত্ব এবং উচ্চশিক্ষা- এই তিনটি ভিন্ন পরিসরের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। নতুন অর্জিত জ্ঞানও তিনি মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান।
প্রত্যন্ত পাহাড়ের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা
একসময় যে পথ শুরু হয়েছিল তবলছড়ির মাটিতে, পরিবারের সঙ
Leave a Reply