“রাষ্ট্রযন্ত্রের অচল চাকা: সমাধান কোথায়”
আইন, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বহীনতার দুর্ভোগে দিশেহারা দেশবাসী
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
বাংলাদেশ আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দেশের সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বশীল মহল—সবাই যেন গভীর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। সাধারণ মানুষ আজ নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ এক বাস্তবতার মুখোমুখি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, অপহরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা—কোনোটিই যেন নিয়ন্ত্রণে নেই। রাস্তায় নেমে মানুষ মনে করছে, দেশে সরকার আছে কি নেই, সেটাই অনিশ্চিত।
রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘুম ও নাগরিক দুর্ভোগঃ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা হওয়ার কথা ছিল—নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরি, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকারের এই কাঠামো কার্যত ঘুমিয়ে আছে। মাঠপর্যায়ে প্রশাসন অসহায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিশেহারা। সাধারণ মানুষ আজ নিজের নিরাপত্তা নিজেই রক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে।
রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও ক্ষমতালিপ্সাঃ
রাজনৈতিক দলগুলো আজও পারস্পরিক রেষারেষি আর ক্ষমতার লড়াইয়ে নিমগ্ন। দেশ ও জাতির সংকটময় মুহূর্তে একে অপরকে দোষারোপ করে চলছে। কোথাও দেখা যাচ্ছে না জাতীয় ঐক্যের আহ্বান, নেই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার বোধ। দলীয় স্বার্থই যেন জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। জনগণের কণ্ঠস্বর আজ অবরুদ্ধ, অথচ রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার খেলা চলছে প্রকাশ্যে।
সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও নৈতিক অবক্ষয়ঃ
রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ভেঙে পড়লে সমাজে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে—আজ আমরা সেই দৃশ্যই প্রত্যক্ষ করছি। বিচারহীনতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা, দুর্নীতি ও দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতি সমাজকে গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ জানে না, কোথায় যাবে, কার কাছে ন্যায় চাইবে। এই পরিস্থিতি কেবল রাষ্ট্রের নয়, জাতির আত্মারও সংকট।
সমাধান কি?
প্রথমত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত ত্বরিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় করা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ক্ষমতার রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আলোচনায় বসা।
তৃতীয়ত, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক।
চতুর্থত, মিডিয়া ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় হতে হবে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষে।
শেষকথাঃ
রাষ্ট্রের মূল শক্তি জনগণ। যদি জনগণ নিরাপত্তাহীন বোধ করে, তবে সেই রাষ্ট্র কার্যত মৃত। এখনই সময় ঘুমন্ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে জাগিয়ে তোলা, রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া, এবং আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া। নতুবা অনিশ্চয়তার এই অন্ধকারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাবে—যার ক্ষতি পূরণ করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়।
লেখক-
শিক্ষক ও সাংবাদিক
sharifsstyle@gmail.com
Leave a Reply