“চিতই পিঠা আর গরুর মাংসে অতিথি আপ্যায়নে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে শিবচরে”
সহিদুল ইসলাম,শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি :-
পিঠা বাঙালির প্রিয় একটি খাবার। শীতকালে ঘরে-ঘরে পিঠার কদর বাড়ে। ইদানীং শুধু বাড়িতে নয়, বাংলার হাটবাজারেও হরেক রকম পিঠার পসরা বসে। শীত মৌসুমে পিঠা বিক্রি করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের অনেক মানুষ এখন জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।
পিঠা নামটি শুনলেই শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার জিভে পানি চলে আসে। পিঠা পছন্দ করেন না এমন মানুষের খোজ পাওয়া দুস্কর। বিশেষ করে গ্রামবাংলায় পিঠার কদর বেশি। শীতকাল এলেই গ্রাম থেকে শহরে চলে হরেক রকমের পিঠা খাওয়ার উৎসব।
এলাকা ভেদে একেক জায়গায় একেক রকম বাহারি পিঠাপুলির বিশেষ কদর রয়েছে। মাদারীপুর অঞ্চলের শিবচর, কালকিনি,রাজৈর এলাকায় মেহমানদের বেশির ভাগ সময়ে চিতই পিঠার সাথে গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও হাসের মাংস, দেশি মুরগির মাংশ দিয়েও আপ্যায়ন করা হয়।
মাদারীপুরের চিতই পিঠা আর গরুর মাংস জগতে এক বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। এছাড়া ও শীত মৌসুমে বাহারি ধরনের পিঠা যেমন পাটি সাপটা, ঝুরি,ভাপা,দুধকলি পিঠাসহ নানা রকম পিঠার আয়োজন চলে গ্রামীন ঘরে ঘরে।
এ ছাড়াও শীত আসলে বিভিন্ন মহল্লায় পিঠার পসরা সাজিয়ে বসেন পিঠা বিক্রেতারা। আর সেই পিঠার স্বাদ নিতে পিঠার দোকানে ভীড় জমান পিঠাপ্রেমিরা। গ্রামবাংলা ছাড়িয়ে এখন পিঠার ঐতিহ্য শহরকেও গ্রাস করেছে। শহরের অলিগলিতে চিতইপিঠার দোকান দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে বেচাকেনাও হয় দেদার। তুলতুলে নরম চিতই পিঠা। তেমনই দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে উপজেলার লালন মঞ্চের সামনের এলাকায় সুস্বাদু পিঠা বিক্রি করছেন খালেদ রহমান ও রেবেকা দম্পতি। চিতই পিঠা ও ভাপা পিঠা বিক্রি করেন তারা। এ পিঠার অনেক নাম আছে- কান্ডে পোড়া পিঠা, চারখোলা পিঠা প্রভৃতি। যে যাই বলুক না কেন খালেদ ও রেবেকা দম্পতির এ পিঠার খ্যাতি এলাকাজুড়ে। উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের পিঠার স্বাদ নিতে সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি দোকানে ভীড় জমান পিঠাপ্রেমিরা।
কথা হয় এই দম্পতির দোকানে পিঠা খেতে আসা উজ্জল মাদবরের সঙ্গে। তিনি বলেন, শীত আসলেই আমরা এখানে পিঠার দোকানে পিঠা খেতে আসি। আহ! কি স্বাদ এ পিঠার। সরিষা ও ঝালের কাসুন্দির সাথে এ পিঠা খেতে সত্যিই অনেক মজা লাগে।
খেতে আসা আরেক পিঠাপ্রেমি আশরাফ বলেন, সন্ধ্যা থেকে এ দোকানে মানুষের ঢল নামে। সিরিয়াল দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় পিঠা খাওয়ার জন্যে। এই পিঠা হাতে পেলেই যেন মনের তৃপ্তি মেটে। প্রায়-ই এখানে বন্ধুদের সাথে নিয়ে পিঠা খেতে আসি।
খালেদ রেবেকা ‘দৈনিক নিরপেক্ষ, কে জানান- পিঠার স্বাদের কথা শুনে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন আমাদের দোকানে। আমরা চেষ্টা করি তাদেরকে সুস্বাদু পিঠা খাওয়ানোর। আর এ পিঠা বিক্রি করেই আমাদের সংসার চলে। যতটুকু সম্ভব সকলের মনের তৃপ্তি অনুযায়ী পিঠা খাওয়ানোর চেষ্টা থাকে সব সময়।
আরেক পিঠাপ্রেমী ব্যবসায়ী আলমাছ মাদবর বলেন চিতই পিঠা আর গরুর মাংস আমার খুবই পছন্দনীয় একটা খাবার। যখন শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে যাই আমার জন্য চিতই পিঠা-গরুর মাংসের আয়োজন থাকে নিয়মিত। পাশাপাশি শীতকালে পাটিসাপটা, দুধকলি, সেমাই পিঠাসহ আরো হরেক রকম পিঠার আয়োজন থাকে।
ইউরোপ প্রবাসী নাসির আকন বলেন আসলে চিতই পিঠার সাথে গরুর মাংস খেয়ে যে তৃপ্তি পাওয়া যায় সেটা অন্য পিঠায় আমি পাইনা। তাই মাঝে মাঝে ছুটি আসি প্রিয় জন্মভূমির মাটির টানে। তাছাড়া পিঠাপুলি আমাদের ঐতিহ্যর একটা অংশ।
সত্যি আবহমানকাল ধরে দেশের গ্রামগঞ্জের ঘরে-ঘরে পৌষ পার্বণে রকমারি পিঠা তৈরি করার রেওয়াজ চলে আসছে। আগে দাদি-নানি, মা, খালা-ফুপুরা পরম মমতায় তৈরি করতেন বিভিন্ন ধরনের পিঠা। হেমন্ত ঋতুতে ধানকাটা শুরু হয়। নতুন সে ধানের চালে তৈরি হয় পিঠা। এ সময় গ্রামে সন্ধ্যা হলেই পাওয়া যেত ঢেকিতে চাল কোটার শব্দ। রাতভর চলত পিঠা তৈরি। পিঠা তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান চালের গুঁড়ো হলেও এর সঙ্গে লাগে গুড় ও ক্ষীরসহ নানা উপকরণ। হেমন্ত থেকে শীতকাল পর্যন্ত পিঠা মৌসুম।
এখন যান্ত্রিক জীবন। সবাই ছুটছে,তবুও গ্রামে হয়তো বিশেষ ভাগ্যবান কেউ-কেউ এখনো মা-দাদি-নানীর হাতে পিঠা খেতে পারছেন। আর শহরে হয়তো কোনো পিঠা উৎসব, না হয় মহল্লার কোনে দাঁড়িয়ে পাশের দোকানে পিঠা খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন। আবার অনেকেই আছেন মহল্লার মোড়ে বসা ফুটপাতে বানানো পিঠা খেতে পছন্দ করেন না। যারা ফুটপাতের পিঠা খান না, সময় করে পরিবারের সবাই কে গ্রামে চলে আসবেন শীতের আমেজ ও গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য পিঠা উতসবে নিজেসহ পরিবার নিয়ে কিছু সময়ের জন্য হলেও ডুবে থাকবেন।
Leave a Reply