“বিক্রমপুরে ১০৮ বছর আগের আলোড়ন সৃষ্টিকারি ডাকাতি”
হারুন রশীদ মুন্সিগঞ্জ টঙ্গীবাড়ী প্রতিনিধি।
১৯১৭ সালের ১৭ অক্টোবর। বিক্রমপুরের আব্দুল্লাহপুর গ্রাম।শীতের সময় গভীর রাত।এই গ্রামের একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর বাড়িতে মহাসমারোহে যাত্রাপালা চলছে।চারদিকের গ্রাম থেকে আসা লোকজন বাড়ির ওঠানে গিজগিজ করছে।যাত্রাপালা চলার সময় প্রায় ত্রিশজনের মত তরুণ পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলে। তারা বিপ্লবী ‘গুপ্ত সমিতি’র সদস্য। তাদের সংগ্রামের শক্তি বৃদ্ধির জন্য অর্থের দরকার ছিলো। তাই এই দুঃসাহসিক ডাকাতির আয়োজন। হাফপ্যান্ট ও হাফশার্ট পড়া যুবকগণ পিস্তল ও রিভালবার উচিয়ে বাড়ির প্রতিটি কোনে দাড়িয়ে গেল।বন্দুকের একটি গুলির শব্দে পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেল।একজন অস্ত্রধারী বিপ্লবী চেচিয়ে বলে ওঠলো, “সাবধান কেউ এক পা নড়বেন না, যে যেখানে আছেন সেখানেই বসে পড়ুন”। আর যারা কিনারায় দাড়িয়ে আছেন তারা ধীরে ধীরে বসে পড়ুন। এ সময় বাড়ির ভিতর থেকে চিৎকারের শব্দ, “আমার সব নিয়ে গেল রে সব নিয়ে গেল”।
এরপর পর তিনটি ফাকা গুলির শব্দ। যাত্রাপালার অভিনেতারা বসে বসে বিড়ি ফুঁকতে লাগলো।
পুরো বাড়ি নিরব,নিস্তব্ধ। কেবল হালকা কানাকানি ফিসফাস শোনা যাচ্ছে।মহিলা দর্শকদেরও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।এসময় ডাকাত দলের নেতৃত্বে থাকা দলনেতা হাতে পিস্তল এসে সবার উদ্দেশ্য বলতে লাগলেন “সবাই শুয়ে পড়ুন,যে ওঠে দাড়াতে যাবে তারই মাথার খুলি ওড়ে যাবে”।ডাকাতের কড়া হুকুম অমান্য করার দুঃসাহস কার? এমন সুকৌশলে ডাকাতরা বাড়িটা ঘেরা করেছিলো যে একটি লোকও বের হবার সুযোগ পাননি৷ অভিনয়ের সময় যেমন শুনশান নীরবতা বিরাজ করে ঠিক তেমনি তখন পুরো বাড়িটা স্তব্ধ হয়ে গেল।দর্শক সারি থেকে একজন বলে ফেললো,” এরা স্বদেশী ডাকাত “। তখন ডাকাত সর্দার চেচিয়ে বললেন, এ বাড়ি থেকে টাকা গেলে আপনাদের ক্ষতি কি? আপনাদের টাকা নিয়েই এ বাড়ির কর্তা দারোগা, ইন্সপেক্টর ও রাজকর্মচারীদের দিয়ে দেয় ও তোষণ করে।আমরা এ টাকার স্বদব্যয় করবো। দেশের স্বাধীনতার কাজে ব্যয় করবো৷এই বাড়ির টাকা নিয়ে যাচ্ছি।এ সময় মহিলাদের স্বর্ণালঙ্কার ভিক্ষা চাওয়া হল।আপনারা অলংকার গুলো খুলে দিন।আপনাদের অলংকার গুলোর স্বদব্যবহার করবো। দেশ স্বাধীন হলে আপনারা অনেক কিছু পাবেন৷
দুজন মহিলা যৎসামান্য কিছু অলংকার খুলে দিলেন৷ডাকাতরূপি একজন বিপ্লবী বললেন, ” যুদ্ধভান্ডারে টাকা দিয়ে আপনারা,আপনাদের স্বামী সন্তানরা ইংরেজ গভমেন্টকে সাহায্য করেছেন”। আমাদের দিবেন না কেন? দিনতো দিন নইলে… । ভিতর থেকে কান্নার রোল ওঠলো। এসময় আরো কয়েকটি অলংকার বেরিয়ে এল।
সিন্ধুক থেকে প্রায় বত্রিশ হাজার টাকা, সোনার তালা ও কিছু অলংকার ডাকাত সর্দারের হস্তগত হয়। ডাকাতি শেষ। আর কালবিলম্ব নয়। যেতে হবে। বাড়ির কর্তার বন্দুকটিও ডাকাতদের হাতে।
ডাকাত সদস্যরা সবার অস্ত্র এক হাতে উচু করে তুলে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ালেন।হুকুম হল মার্চ করার।সৈনিকের কায়দায় মার্চ করে তারা চলে যেতে লাগলেন। কয়েক শত দর্শক বীরদর্পে তাদের চলে যাওয়া দেখছে।আব্দুল্লাহপুর গ্রামের উত্তর পশ্চিমে খরস্রোতা নদীতে রাখা নৌকায় ডাকাতরা ওঠে দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছে।এসময় গ্রামবাসী ডাকাতদের ধরতে ছুটলেন। ধু ধু অন্ধকার শীতের রাতে ডাকাত দলের নৌকা স্রোতের সাথে চলছে কোন এক অজানা তীরের পানে।টেলিগ্রাফের তার আগেই কেটে দেওয়া হয়েছিলো৷ ঢাকায় খবর পাঠানো যায়নি। যাত্রাপালা সেদিন রাতে আর হয়নি৷ আব্দুল্লাহপুরের সেই বাড়িতে সারারাত কান্নার রোল ওঠে৷ বাড়ির কর্তার হাত পা বাধা ছিলো। পরে সবাই দ্রুত তার হাত পায়ের বাধন খুলে দেয়৷ যাত্রাঅভিনয় ও ডাকাতি শেষ হয়৷ সেদিন কোন ডাকাত সদস্যকে ধরা যায়নি৷ সবাই বুঝে যায় এরা সবাই স্বদেশী ডাকাত।
শিক্ষিত যুবকরা দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য ‘গুপ্ত সমিতি’ করেছিলেন৷ ঐ গুপ্ত সমিতি’র সদস্যরা ডাকাতি করে অর্থ সংগ্রহ করে। আব্দুল্লাহপুর গ্রামের ডাকাতিতে যে নৈপুণ্য দেখিয়ে সুকৌশলে কাজ করেছে তা অপূর্ব। তারা একটি লোককেও গুলি করেনি বা মারেনি। সাধারণ ডাকাতদের তা করা ছিলো অসম্ভব। আইন শৃংখলা বাহিনী এ ডাকাতির ঘটনার কোন হদিশ করতে পারেনি। কত লোককে সন্দেহ করে গ্রেফতার ও নির্যাতন করেছে কিন্তু ঐ ডাকাত দলের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি ।
Leave a Reply