“নভেম্বরে আরও ২০ বার ভূমিকম্পের আশঙ্কা ৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের হুঁশিয়ারি বিশেষজ্ঞদের”
মো. শাকিল হোসাইন জাবি প্রতিনিধি:
ঢাকা ও আশপাশের এলাকার মানুষ এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। দুই দিনের ব্যবধানে রাজধানী ও নরসিংদীতে পরপর চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটির উৎপত্তিস্থল নরসিংদী এবং একটি ছিল ঢাকায়। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকালে একটি এবং শনিবার (২২ নভেম্বর) দিনের বিভিন্ন সময়ে আরও তিনটি ভূমিকম্পে জনমনে শঙ্কা আরও বেড়েছে।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঢাকার প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদী থেকে উৎপত্তি হওয়া রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ছিল। উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে, যা কম গভীর হওয়ায় ব্যাপক ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কেঁপে ওঠে। এ ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ১০ জন নিহত এবং ৬০০-র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
মেগাথার্স্ট ফল্ট থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় একটি বিশাল ‘গোপন ফল্ট’ শনাক্ত হয়েছে, যা ৯ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্প ঘটাতে সক্ষম বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট সীমান্তে গত ৮০০ থেকে ১,০০০ বছর ধরে জমে থাকা শক্তি এখনও মুক্ত হয়নি। এই অঞ্চলকে তিনি ‘রিং অব ফায়ার’-এর মতোই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আগামী এক সপ্তাহে আরও ২০ বার ভূমিকম্পের শঙ্কা
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন,
“মাত্র দুই দিনে চারটি ভূমিকম্প হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী এক সপ্তাহে আরও প্রায় ২০টি ভূকম্পন অনুভূত হতে পারে।”
তিনি জানান, নরসিংদীকেই সাম্প্রতিক সব ভূমিকম্পের মূল উৎপত্তিস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
তার মতে, “৫.৭ মাত্রার চেয়েও বড় কোনো ভূমিকম্প হলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ দুর্যোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ এখন উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকির মুখে।”
বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের রুবাইয়াত কবির জানান, বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা—এই তিনটি শক্তিশালী টেকটোনিক প্লেটের জটিল সংযোগস্থলে অবস্থিত। বর্তমানে প্লেটগুলো ‘লকড’ অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। ভারতীয় প্লেট ইউরেশীয় প্লেটের দিকে ধাক্কা দিতে থাকলে বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটতে পারে।
১৭৬২ সালের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা
টেকনাফ-মিয়ানমার ফল্ট লাইনে ১৭৬২ সালে ঘটে যাওয়া ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ৩ মিটার উঁচু হয়ে এসেছিল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেই একই এলাকায় এখন নতুন করে শক্তি জমছে। প্লেট চলাচলের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে।
মাটি পরীক্ষা চলছে
ঘোড়াশালের ফাটল থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ।
বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ স ম ওবায়দুল্লাহ জানান, “নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে ভূমিকম্পের প্রকৃতি, উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ও টেকটনিক চাপ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
ভূমিকম্প হলে করণীয়: জীবন বাঁচাতে সচেতনতার বিকল্প নেই
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর বিশেষজ্ঞরা জরুরি সতর্কতা ও করণীয় তুলে ধরেছেন। আতঙ্ক নয়, ঠাণ্ডা মাথায় সঠিক সিদ্ধান্তই জীবন বাঁচাতে পারে।
ভূমিকম্প হলে ঘরে কী করবেন
শক্ত টেবিল বা ওজনদার আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন।
মাথা ও ঘাড় হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন।
দরজার ফ্রেম বা শক্ত দেয়ালের পাশে দাঁড়ান।
লিফট ব্যবহার করবেন না।
জানালা, গ্লাস, আলমারি বা ভারী জিনিসের কাছ থেকে দূরে থাকুন।
গ্যাসের চুলা ও বৈদ্যুতিক সুইচ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।
বাইরে থাকলে কী করবেন
খোলা জায়গায় অবস্থান নিন।
ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, সেতু বা সাইনবোর্ড থেকে দূরে থাকুন।
রাস্তায় দাঁড়ানো এড়িয়ে চলুন।
নদী বা সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় থাকলে দ্রুত নিরাপদ উচ্চভূমিতে চলে যান—সুনামির ঝুঁকি থাকতে পারে।
গাড়িতে থাকলে করণীয়
গাড়ি থামিয়ে রাস্তার পাশে বা খোলা স্থানে দাঁড়ান।
ওভারপাস বা সেতুর নিচে থামবেন না।
কম্পন থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই থাকুন।
ভূমিকম্পের পর জরুরি করণীয়
গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ লাইন পরীক্ষা করুন।
দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ করবেন না।
আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।
সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
জরুরি প্রস্তুতি: পরিবারে যা থাকা জরুরি
প্রতিটি বাড়িতে একটি জরুরি ‘ইমার্জেন্সি কিট’ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা:
টর্চলাইট
ব্যাটারি
পানির বোতল
শুকনো খাবার
প্রাথমিক চিকিৎসার বক্স
গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কপি
পাওয়ারের ব্যাংক
এছাড়া—
পরিবারের সবাইকে জরুরি নম্বর মুখস্থ করান।
দুর্বল ভবন হলে কাঠামো মজবুত করুন।
স্কুল–কলেজে নিয়মিত ভূমিকম্প ড্রিল চালু রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সর্বশেষ সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্লেট কাঠামো, অতীতের ইতিহাস ও বর্তমান কম্পনসমূহ সবই একটি বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তাই আতঙ্ক নয়—আগাম প্রস্তুতি ও সচেতনতা—এখনই আমাদের মূল অস্ত্র।
বাংলাদেশকে সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুত হতে হবে।
Leave a Reply