“জনগণের করের টাকায় ভিআইপি প্রটোকল—কোন যুক্তিতে”
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
রাষ্ট্রের মৌলিক ধারণা হলো—জনগণ ক্ষমতার উৎস এবং জনস্বার্থই শাসনের একমাত্র ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা বহু সময়ই এই নীতির বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে আমাদের দেশে “জনগণের সেবক” পরিচয়ধারী রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি কিংবা ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিদের জন্য যে উচ্চমাত্রার ভিআইপি প্রটোকল বজায় রাখা হয়, তা বিস্ময় তৈরি করে। সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি সড়ক, হাসপাতাল বা সরকারি সেবা কেন্দ্রগুলো ভিআইপিদের চলাচলে প্রায়ই অচল হয়ে পড়ে—যেন রাষ্ট্র চলে উল্টো দিকে, সেবক হয়ে ওঠে মালিক, আর মালিক জনগণ হয় উপেক্ষিত।
ভিআইপি সংস্কৃতির শেকড় কোথায়?
আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে ভিআইপি প্রটোকল বহুদিন ধরে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান যুগ এবং স্বাধীনতার পরের বিভিন্ন শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও সুবিধাকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সড়কে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা নন—একজন এমপি, একজন জেলা প্রশাসক, এমনকি তাদের পরিবার সদস্যদের চলাচলের সময়ও পুলিশি ব্লকেড, সাইরেন বাজানো গাড়ি ও সাধারণ মানুষের যানবাহন থামিয়ে দেওয়াই যেন “স্বাভাবিক” হয়ে গেছে।
জনগণের দুর্ভোগ কে দেখবে?
ভিআইপি প্রটোকল বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনে বিরাট দুর্ভোগ তৈরি করে।
>> স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় দেরি করে,
>> অফিসগামী মানুষ দীর্ঘ সময় জ্যামে আটকে থাকে,
>> অ্যাম্বুলেন্সও কখনো কখনো রাস্তার পাশে অপেক্ষা করে ভিআইপি গাড়ি যাওয়া পর্যন্ত,
—এমন অমানবিক পরিস্থিতি দেশের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়।
একজন জনগণের সেবক যদি তাঁর জন্য শত মানুষের চলাচল আটকে রাখেন—তাহলে সেটি তাঁর দায়িত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ জনগণের প্রতিনিধি বা সরকারি কর্মচারীর প্রধান পরিচয় ক্ষমতাধারী নয়, সেবাদানকারী।
সেবার নামেই কি অবাধ ক্ষমতা?
রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিরাপত্তা প্রয়োজন—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ‘নিরাপত্তা’ আর ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ এক বিষয় নয়।
সমস্যা হলো—আমাদের দেশে প্রটোকল ক্রমেই সুবিধার রূপধারণ করেছে।
অনেক ক্ষেত্রে এটি নিরাপত্তার চাইতেও “প্রদর্শন” হয়ে উঠেছে। দ্রুত গাড়ির বহর, সাইরেন, অধিক সময় রাস্তা খালি করে রাখা—এসব আচরণ সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি বা সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে জনতার দূরত্ব যত বাড়ে, গণতন্ত্র তত দুর্বল হয়।
সেবকের অহংকার রাষ্ট্রের ক্ষতি
যখন একটি সমাজে সেবকেরা নিজেদের প্রভু মনে করতে শুরু করেন, তখন রাষ্ট্রের মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
>> সেবার মান কমে যায়,
>> জবাবদিহি হারিয়ে যায়,
>> জনগণের আস্থা দুর্বল হয়,
>> গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়।
রাষ্ট্র যেদিন বুঝবে যে ভিআইপি নয়—প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবন সমান মূল্যবান, সেদিনই দেশ এগোবে। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয় যখন রাষ্ট্র জনগণের সঙ্গে একই পথে হাঁটে, তাদের উপরে চেপে বসে নয়।
প্রটোকল কমানোর উদ্যোগ—সময় এখনই
বিশ্বের অনেক দেশেই প্রটোকল সংস্কৃতি কমিয়ে স্বাভাবিক চলাচলের নিয়ম চালু হয়েছে। ইউরোপের বহু রাষ্ট্রনায়ক ট্রাফিকে আটকে থাকেন, লাইনে দাঁড়ান, হেঁটে অফিসে যান—এতে তাদের মর্যাদা কমে না; বরং বাড়ে। জনগণের কষ্ট না বাড়িয়ে নিরাপত্তাকে সুসংগঠিত করা বাংলাদেশের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব নয়।
সেবকের জন্য রাস্তা খালি রাখার চেয়ে—পথচারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রকৃত কর্তব্য।
জনগণের রাষ্ট্রে জনগণই ভিআইপি
যে রাষ্ট্রে জনগণকে সাইডে দাঁড়াতে বলা হয়, আর “সেবকের” গাড়িকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়—সেই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে অর্ধেক।
জনগণের টাকায় বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী, জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রের যেকোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি—সবার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত জনগণের সেবক।
আর সেবকের কখনোই ভিআইপি প্রটোকল দাবি করার নৈতিক অধিকার নেই।
লেখক–
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর।
Leave a Reply