“রাজনীতির দখলে স্কুল–কলেজ: শিক্ষা ব্যবস্থার নিঃশব্দ পতন”
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ।
বাংলাদেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল একটি স্থিতিশীল, পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রশাসন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে গত কয়েক দশকে স্কুল–কলেজ পর্যায়ের প্রশাসনে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এমন এক সংকট তৈরি করেছে, যা এখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, মান, মূল্যবোধ, শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা—সবকিছুই আজ রাজনীতির আগ্রাসী প্রভাবের শিকার।
১.নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দলীয় প্রভাব
রাজনীতিকরণ সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্তি, প্রধান শিক্ষক/প্রভাষকের পদোন্নতি, এমনকি অফিস সহায়ক নিয়োগ পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা নয়; বরং দেখা হয় রাজনৈতিক পরিচয়, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য বা নির্বাচনী সময়কার ভূমিকা। এ ধরনের অনিয়ম শুধু দক্ষ জনবলকে উপেক্ষা করে না, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও কর্মপরিবেশকে দুর্বল করে দেয়।
একজন শিক্ষক তাঁর মেধা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তির ছত্রছায়ায় পদ পেলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের মানসিক উন্নয়ন বা পাঠদানে মনোযোগ দেওয়া থেকে সরে এসে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও প্রভাব রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় দলীয় স্বার্থ রক্ষা, শিক্ষার্থীর মানোন্নয়ন নয়।
২.পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক লোক বসানো
স্কুল–কলেজ পরিচালনা কমিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বেশিরভাগ কমিটিতেই বসানো হয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা দলীয়ভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের। তারা শিক্ষা উন্নয়ন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক সুবিধা অথবা নির্বাচনী শক্তির অংশ হিসেবে ব্যবহার করেন।
ফলে—
>> সিদ্ধান্ত হয় ব্যক্তিগত স্বার্থে,
>> বাজেট ব্যবহারে স্বচ্ছতা হারায়,
>> শিক্ষক–শিক্ষার্থীর প্রকৃত সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থাকে।
>> এভাবে পুরো শিক্ষা পরিবেশ ভেঙে পড়ে।
৩.শিক্ষার্থীদের উপর রাজনৈতিক প্রভাব ও অস্থিতিশীলতা
রাজনীতির প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহভাবে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও ছাত্র–ছাত্রীদের বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যেতে দেখা যায়। ছাত্র সংগঠনের মিছিল, মিটিং, সংঘর্ষ অনেক সময় তাদের পড়াশোনাকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দেয়।
এর ফলে—
>> শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়,
>> ক্লাসে উপস্থিতি কমে,
>> ভয় ও বিশৃঙ্খলার সংস্কৃতি তৈরি হয়,
>> সাধারণ শিক্ষার্থীরা অসহায় হয়ে পড়ে।
>> শিক্ষাঙ্গন শিক্ষার জায়গা না হয়ে ক্ষমতার প্রদর্শনের জায়গায় পরিণত হয়।
৪.শিক্ষা একধরনের ব্যবসায় রূপ নিচ্ছে
রাজনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার কারণে অনেক বেসরকারি স্কুল–কলেজ এখন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অযৌক্তিক ফি, অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা–সুবিধার ঘাটতি সবই এই রাজনৈতিক ছত্রছায়ার দাপটে চলে।
ফলাফল—
>> মানসম্মত শিক্ষা সংকুচিত,
>> অভিভাবকের বাড়তি চাপ,
>> শিক্ষার্থীর মানসিক বিপর্যয় বৃদ্ধি।
৫.শিক্ষক–কর্মচারীর পেশাগত স্বাধীনতা হুমকির মুখে
শিক্ষকরা জ্ঞানের বাহক। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে তাঁরা নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ও স্বাধীনতা হারাতে বসেছেন। অনেকে বাধ্য হন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষে অবস্থান নিতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা, শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা—সবই তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত দায়িত্বে পরিণত হয়।
এই চাপ ও ভয়ের সংস্কৃতি শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, শিক্ষা পরিবেশ হয়ে ওঠে অনিরাপদ।
৬.শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থাহীনতার সৃষ্টি
অভিভাবকরা এখন আর পূর্বের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করতে পারেন না। তারা কোচিং, ব্যয়বহুল বেসরকারি স্কুল বা হোম টিউটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এতে সাধারণ শিক্ষার মান আরও নিম্নমুখী হচ্ছে।
আস্থা হারানো একটি জাতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি—কারণ শিক্ষা ব্যর্থ হলে উন্নয়নও ব্যর্থ হয়।
৭.সমাধান কোথায়?
প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করে কঠোর আইন প্রণয়ন
>> যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা
>> পরিচালনা কমিটি রাজনৈতিকমুক্ত করা
>> শিক্ষার্থীদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখা
>> বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় রাখা
স্কুল–কলেজের প্রশাসনে রাজনৈতিক দখল কেবল শিক্ষা ব্যবস্থাকে নয়, পুরো জাতিকে গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। যারা শেখার বয়সে, তারা বিভক্তি, বিশৃঙ্খলা ও ক্ষমতার খেলায় জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষকরা হারাচ্ছেন পেশাগত স্বাধীনতা; অভিভাবকরা হারাচ্ছেন আস্থা।
একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর হতে পারে না।
শিক্ষা যদি আলোর পথ দেখায়, তবে সেই পথকে রাজনৈতিক ছায়া থেকে মুক্ত করতেই হবে—এটাই সময়ের দাবি।
লেখক —
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর
Leave a Reply