“ভাইরাল হওয়ার দৌড়: অশ্লীলতার দিকে ধাবমান এক প্রজন্ম”
মো: শাকিল হোসাইন জাবি প্রতিনিধি :
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এখন যেন তরুণদের নতুন অভিভাবক। কোন কনটেন্ট কত দ্রুত ভাইরাল হবে—তা নিয়েই ব্যস্ত অনেকেই। অথচ এই ভাইরাল হওয়ার অন্ধ দৌড়ে আজকের তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ অশ্লীলতা, অশালীন অভিনয়, অনৈতিক দৃশ্যায়ন এমনকি আত্মসম্মানহানিকর কর্মকাণ্ডকেও তুচ্ছ করে দেখছে। “যা ইচ্ছে করছে, বলছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে”—এ রকম প্রবণতা ঢুকে পড়ছে এক নিষ্ক্রিয় মানসিকতার ভেতর।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়; বরং এটি একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও প্রজন্মব্যাপী।
কেন এমন হচ্ছে?—বর্তমান প্রেক্ষাপট
১. ভাইরাল হওয়ার বাসনা
আজকের যুগে পরিচিতি মানেই অনলাইন ফলোয়ার। ফলে কন্টেন্টে যত বেশি “শক ভ্যালু”, তত বেশি ভিউ।
তরুণরা তাই সহজ পথ—অশ্লীলতা বা বিতর্কিত কিছু—নিয়ে কনটেন্ট বানাচ্ছে।
২. পরিবার-সমাজের পর্যবেক্ষণ দুর্বলতা
ডিজিটাল দুনিয়া দ্রুতগতিতে বদলালেও পরিবারিক মনিটরিং বা সামাজিক দিকনির্দেশনা সেই গতিতে আপডেট হয়নি।
৩. অর্থনৈতিক প্রলোভন
একটি ভাইরাল ভিডিও বা রিল অনেক সময় মাসিক উপার্জনের সমান ইনকাম এনে দেয়। ফলে অনেকে শালীনতা বনাম ভাইরাল হওয়ার মধ্যে দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিচ্ছে।
৪. মানসিক স্বীকৃতির ক্ষুধা
অনেক তরুণ সামাজিক স্বীকৃতি, প্রশংসা বা মনোযোগের অভাব পূরণ করতে লাইক–কমেন্টকে আশ্রয় করছে।
ইতিবাচক দিক—যা অস্বীকার করা যায় না
যদিও বিষয়টি মূলত নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে, তবে কিছু বাস্তব ইতিবাচক দিকও আছে—
অনেক তরুণ সামাজিক সমস্যা, মানবিক গল্প, শিক্ষামূলক ভিডিও ভাইরাল করে জনমত তৈরি করছে।
ডিজিটাল দক্ষতা, ভিডিও এডিটিং, কনটেন্ট নির্মাণ—এগুলো তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াচ্ছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তাদের সৃজনশীলতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
তবে সমস্যাটি তখনই তৈরি হয় যখন সৃজনশীলতার বদলে অশ্লীলতা জনপ্রিয়তার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
নেতিবাচক প্রভাব—এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম
১. নৈতিক অবক্ষয়
অশ্লীলতা ও অনৈতিক কনটেন্ট দেখে তরুণরা সঠিক–ভুলের বোধ হারাচ্ছে।
২. সম্পর্কের অবনতি
এতে পরিবারে অশান্তি, বন্ধুবান্ধব ও সামাজিক সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি
লাইক–কমেন্ট না পেলে হতাশা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
৪. শিক্ষা ও কর্মজীবনে মনোযোগহীনতা
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কনটেন্ট তৈরি ও স্ক্রলিং—পড়াশোনা ও কাজের ক্ষতি করছে।
৫. সমাজে নেতিবাচক বার্তা ছড়ানো
অল্প বয়সী শিশু ও কিশোরেরা এগুলো দেখে ভুল ধারণা পোষণ করছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী-
বাংলাদেশে ২০২৪–২৫ সালের বিভিন্ন ডিজিটাল আচরণ গবেষণায় দেখা গেছে—
১৫–২৪ বছর বয়সী ৭২% তরুণ প্রতিদিন ২–৪ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করে।
৩৮% তরুণ স্বীকার করেছে যে ভাইরাল হওয়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২২% তরুণ অন্তত একবার “অশালীন বা অনৈতিক” কনটেন্ট পোস্ট করে পরে ডিলিট করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে নিজেদের জীবনে চাপ অনুভব করে এমন তরুণের সংখ্যা ৪৮%।
উৎস: ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২4–25 সালের ডিজিটাল আচরণ সমীক্ষা (সংক্ষেপে উপস্থাপিত)।
বিজ্ঞজন কী বলছেন?
ড. তারিকুজ্জামান, সমাজবিজ্ঞানী
“আজকের তরুণরা শূন্যতার মধ্যে বাস করছে। পরিবার ও সমাজ তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম পারছে। ফলে অস্থিরতা ও মনোযোগের সংকট বাড়ছে।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেহজাবিন রহমান
“লাইক–কমেন্ট মস্তিষ্কে ক্ষণস্থায়ী ডোপামিন বাড়ায়। এতে তরুণরা দ্রুত তৃপ্তির অভ্যাস পেয়ে যায়, যা তাদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি করতে প্ররোচিত করে।”
আইটি বিশেষজ্ঞ রাশেদ সুমন
“ডিজিটাল সাক্ষরতা ছাড়া ফোন হাতে তুলে দেওয়া মানে শিশুর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার মতো।”
সমাধান ও করণীয়—পথ দেখায় বিশেষজ্ঞরা
১. পরিবারে ডিজিটাল মনিটরিং জোরদার
শিশু–কিশোর কী দেখে, কাদের ফলো করে—এসব পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
নিয়মিত কথোপকথন সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
২. স্কুল–কলেজে ডিজিটাল সেফটি শিক্ষা
ডিজিটাল লিটারেসি ক্লাস
অনৈতিক কনটেন্টের প্রভাব নিয়ে কাউন্সেলিং
৩. সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কন্টেন্ট মনিটরিং ও কঠোরতা
অশ্লীল বা ক্ষতিকর কন্টেন্ট নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ।
৪. বিকল্প সৃজনশীল কনটেন্ট উৎসাহ দেওয়া
সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
গল্প বলা, শর্ট ফিল্ম, ফটোগ্রাফি—ইত্যাদি প্রকৃত সৃজনশীলতাকে এগিয়ে নেওয়া
৫. মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা
হতাশা, একাকিত্ব বা অনলাইন আসক্তি হলে কাউন্সেলিংয়ে যাওয়া।
Leave a Reply