“সামাজিক অবমাননা ও নির্যাতনের অভিযোগে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা”
ধীমান ঢালী, ববি প্রতিনিধি
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) বাংলা বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগী আত্মহত্যা করেছেন। রোববার সকালে গোপালগঞ্জ জেলার বৌলতলী এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আত্মহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান।
মৃত্যুর আগে গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া একটি দীর্ঘ পোস্টে শুভ নিজের পরিচয় ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংকটের বর্ণনা দেন। ওই পোস্টে তিনি কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি এবং বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে তাঁর মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী করেন।
ফেসবুক পোস্টে শুভ উল্লেখ করেন, প্রায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তরুণীর জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাতে তাঁর বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা শুভ শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন। তাঁর অভিযোগ, সে সময় তাঁকে মারধর করার পাশাপাশি ভয়ভীতি প্রদর্শন করে একটি মিথ্যা ভিডিও ধারণ করতে বাধ্য করা হয়, যেখানে তাঁকে চুরির অপবাদ স্বীকার করতে বলা হয়।
শুভ লেখেন, এই ঘটনার ফলে তাঁর সামাজিক সম্মান মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয় এবং তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এছাড়া অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে তাঁর সম্পর্কটি মেনে নেওয়া হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। অপমান, হেয়প্রতিপন্ন হওয়া এবং তীব্র সামাজিক চাপে পড়ে তিনি চরম মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। নিজের মৃত্যুর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে শুভ তাঁর পোস্টে এই পরিস্থিতিকে “ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. শারমিন আক্তার বলেন, “শুভর মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। ছেলেটিকে বিভাগ থেকে আমরা সবসময়ই দেখভাল করেছি—সুবিধা-অসুবিধা যেকোনো সময় তার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। সকালে এমন একটি খবর আমাদেরকে গভীরভাবে বিষণ্ন ও পীড়িত করেছে। ইতোমধ্যে আমাদের বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুভর গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি বাসের আবেদন জানিয়েছি। বিভাগ থেকে প্রয়োজনে আরও সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
শুভর সহপাঠীরা জানান, তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছিলেন। তাঁর এমন অকাল প্রয়াণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহপাঠী ইউসুফ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, “এই মৃত্যু কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি নিষ্ঠুর অবহেলা ও অমানবিক আচরণের ফল। একটি তরতাজা প্রাণ হারিয়ে গেছে, যার দায় কেউ এড়াতে পারে না। আমাদের বন্ধু আজ নেই, কিন্তু তার মৃত্যু যেন শুধু একটি খবর হয়ে হারিয়ে না যায়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের নীরব থাকা চলবে না। এখন সময় শোকের নয়—প্রতিবাদের এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার। একটি জীবনের মূল্য কখনোই এত সস্তা হতে পারে না।
Leave a Reply