“জাবি মেডিকেলে রিপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ, তদন্তে প্রশাসন”
মোঃ শাকিল হোসাইন, জাবি প্রতিনিধি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারে রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট প্রস্তুত ও সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মেডিকেল সেন্টারের দুই টেকনিক্যাল অফিসার ও এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন এক শিক্ষার্থী। অভিযোগের পর শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠনের আশ্বাস দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
অভিযুক্তরা হলেন মেডিকেল সেন্টারের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড ইমিউনোলজি ল্যাবরেটরির টেকনিক্যাল অফিসার কে. এম. নাজমুল হোসাইন রাসেল, হেমাটোলজি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিভাগের টেকনিক্যাল অফিসার মো. নাঈমুল ইসলাম নাঈম এবং প্রশাসনিক অফিসার খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. রাশেদ শেখ এ বিষয়ে মেডিকেল সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত চিফ মেডিকেল অফিসার (সিএমও) ডা. মো. শামসুল আলম খান লিটনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
অভিযোগপত্রে রাশেদ শেখ উল্লেখ করেন, গত ১১ আগস্ট তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারে রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করান। ওই পরীক্ষার রিপোর্টে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১৫.৭ গ্রাম/ডেসিলিটার উল্লেখ করা হয়। ফলাফলটি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় পরবর্তীতে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে পুনরায় একই পরীক্ষা করান। সেখানে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পাওয়া যায় ৮.৮ গ্রাম/ডেসিলিটার।
রাশেদের দাবি, গত এক দশকে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কখনো ১০-এর বেশি ছিল না। তবে ওই সময় অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলমান থাকায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রবিবার সকালে তিনি ভারপ্রাপ্ত সিএমওর সঙ্গে যোগাযোগ করলে সিএমও দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই টেকনিক্যাল অফিসারের কাছে বিষয়টি জানতে চান। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা জানান যে ওই সময় প্যাথলজি বিভাগের যন্ত্রপাতি ত্রুটিপূর্ণ থাকায় পরীক্ষার ফলাফলে ভুল হয়ে থাকতে পারে।
পরবর্তীতে প্রশাসনিক অফিসার খন্দকার জাহাঙ্গীর আলমের কাছেও বিষয়টি জানতে চাইলে তিনিও যন্ত্রপাতির ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বলে অভিযোগে বলা হয়।
এ সময় উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ১১ আগস্ট সম্পন্ন হওয়া পরীক্ষার সংশ্লিষ্ট রেকর্ড ও তথ্য দেখতে চাইলে প্রথমে তথ্য সংরক্ষিত আছে বলে জানানো হয়। তবে প্রায় তিন ঘণ্টা অনুসন্ধানের পরও কোনো হার্ডকপি বা সফটকপি উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। একই সঙ্গে ওই সময়ে যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার বিষয়ে কোনো লিখিত নথি বা বিজ্ঞপ্তিও দেখানো হয়নি বলে তারা জানান।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তারা মেডিকেল সেন্টারের প্রশাসনিক কক্ষ তালাবদ্ধ করে দেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম, প্রক্টর অধ্যাপক জাকির হোসেন, সহকারী প্রক্টর আবদুছ সাত্তার জয়, জাকসুর খাদ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক হুসনি মোবারকসহ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা মেডিকেল সেন্টারের যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া ও নতুন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের কাগজপত্র পর্যালোচনা করেন। সেখানে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি ১৫ আগস্ট নষ্ট হয় এবং ১৮ আগস্ট নতুন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হয়। ফলে ১১ আগস্টের পরীক্ষার সময় যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার দাবির সঙ্গে নথিপত্রের অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগকারী ও উপস্থিত শিক্ষার্থীরা দাবি করেন।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে প্রস্তুতের তারিখ ১২ আগস্ট উল্লেখ থাকলেও ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল বলে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, এতে রিপোর্ট প্রস্তুতের প্রক্রিয়া নিয়ে আরও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম বলেন, “মেডিকেল সেন্টার একটি সংবেদনশীল সেবা প্রতিষ্ঠান। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অসঙ্গতি কাম্য নয়। প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্যগত অসামঞ্জস্যতার বিষয় সামনে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করে তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক অফিসার খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম এবং টেকনিক্যাল অফিসার কে. এম. নাজমুল হোসাইন রাসেল প্রায়ই নির্ধারিত অফিস সময়ের পরে কর্মস্থলে উপস্থিত হন।
Leave a Reply