“বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ১৮ দফা দাবি, তাজউদ্দীন হলে প্রশাসন-শিক্ষার্থী বৈঠক”
মোঃ শাকিল হোসাইন, জাবি প্রতিনিধি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান লিফট, বিদ্যুৎ, ডাইনিং, ক্যান্টিন ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আলোচনায় বসেছে হল প্রশাসন। আলোচনায় শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ১৮ দফা দাবির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন হল প্রভোস্ট।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে হল প্রভোস্টের কক্ষে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে হল ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ আহম্মেদ, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. আবদুছ ছাত্তার উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে লিফট ও বিদ্যুৎ সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা দুই দফায় হল প্রভোস্টের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। বিশেষ করে গত ২০ সেপ্টেম্বর লিফট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, ১০ তলা আবাসিক হলে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক লিফট অচল, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর সেবা অনিয়মিত এবং বাথরুম, ডাইনিং ও ক্যান্টিন ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা বিদ্যমান।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় সেটি চালু রাখা হয় না। ফলে উচ্চতলার শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে লিফটের অচলাবস্থা, শর্ট সার্কিটজনিত বৈদ্যুতিক ঝুঁকি, বাথরুমের পানি পড়া, ডাইনিং ও ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবারের বৈঠকে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে হলের সার্বিক পরিবেশ ও সেবার মান উন্নয়নে ১৮ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ২৪ ঘণ্টা লিফট চালু রাখা, ডাইনিং ও ক্যান্টিনের খাবারের মানোন্নয়ন, বাথরুম ও বৈদ্যুতিক সমস্যার দ্রুত সমাধান, প্রতিটি ফ্লোরে পানির ফিল্টার স্থাপন, জিমনেসিয়াম ও সিসিটিভি সুবিধা বৃদ্ধি এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রার্থনা কক্ষের ব্যবস্থা করা।
বৈঠকে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. লুৎফুল ইলাহী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “হলের মধ্যে কোনো ধরনের অনিয়ম দেখলে আমাকে জানাবে। কোনো স্টাফ যেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ না করে। শিক্ষার্থীরাই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
তিনি আরও বলেন, “হলের বিভিন্ন সমস্যা ধাপে ধাপে সমাধান করা হবে। ডাইনিং ও ক্যান্টিনের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আলোচনা সভায় উপস্থিত সহকারী প্রক্টর ড. আবদুছ ছাত্তার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা শোনেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
বৈঠকে উপস্থিত এক শিক্ষার্থী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সমস্যা বা সংকট দেখা দিলে সহকারী প্রক্টর ড. আবদুছ ছাত্তারকে প্রায়ই ঘটনাস্থলে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন তিনি।”
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, “সকল বাধা ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমরা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিগুলো প্রশাসনের সামনে তুলে ধরেছি। প্রভোস্ট স্যার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। আমরা আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যেই দাবিগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রতি যে আস্থা রেখেছেন, তা ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করতে আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। তবে দাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে আরও কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে।”
১৮ দফা দাবি এক নজরে
১. বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
২. ২৪ ঘণ্টা লিফট চালু রাখা।
৩. ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নয়ন করা।
৪. বাথরুমের পানি পড়ার সমস্যা দ্রুত সমাধান করা।
৫. ডাইনিংয়ের খাবারের মান ও মাছ-মাংসের পরিমাণ বৃদ্ধি করা।
৬. শর্ট সার্কিটের কারণে বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুত পুনঃস্থাপন করা।
৭. কমোড বাথরুম নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করা।
৮. ক্যান্টিন ও হলের দোকানগুলোর ভাড়া কমানো।
৯. মসজিদের উন্নয়ন ও রং করার কাজ দ্রুত শুরু করা।
১০. হল ফান্ড থেকে ডাইনিংয়ে ভর্তুকি প্রদান করা।
১১. ডাইনিংয়ের পানি পড়ার সমস্যা সমাধান করা।
১২. যেসব দরজায় হাতল নেই সেখানে হাতল স্থাপন করা।
১৩. যেসব টেবিলে লাইট নেই সেখানে লাইটের ব্যবস্থা করা।
১৪. ডাইনিংয়ের ফ্রিজ শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা।
১৫. সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রার্থনা কক্ষের ব্যবস্থা করা।
১৬. জিমনেসিয়াম ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা এবং প্রয়োজনীয় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা।
১৭. প্রতিটি ফ্লোরে বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপন ও হলের বাগান উন্নয়ন করা।
১৮. হলের নামফলক স্থাপন করা।
উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন ধরে লিফট, বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় দুই দফা প্রতিবাদ কর্মসূচি ও প্রভোস্ট কক্ষ তালাবদ্ধ করার ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ মঙ্গলবারের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়। এখন দাবিগুলোর বাস্তবায়ন কতটা অগ্রগতি লাভ করে, সেদিকেই নজর শিক্ষার্থীদের।
Leave a Reply