“নবায়নযোগ্য শক্তিতেই পরিচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ: তরুণরাই দিশারী”
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশ দূষণ এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার মধ্যে বায়ু দূষণ অন্যতম। বিশেষ করে নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং যানবাহনের ধোঁয়া জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এটি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA) এর একটি নতুন গবেষণা (জানুয়ারি ২০২৫ এ প্রকাশিত) অনুযায়ী: বাংলাদেশে বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর ১০২,৪৫৬ (এক লাখ দুই হাজার চারশো ছাপান্ন) মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বায়ু দূষণের কারণে ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ বৃদ্ধি পায়, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব হুমকি। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য শক্তিই পরিচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবচেয়ে কার্যকর টেকসই পথ হিসেবে আশার আলো দেখাচ্ছে, আর এই আন্দোলনে তরুণ সমাজই প্রধান দিশারী।
*বায়ু দূষণের অদৃশ্য শিকার: সংকট ও কারণ:-*
বায়ু দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় নগরে দ্রুত শিল্পায়ন ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা । বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র কণা (PM2.5), কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ, হৃদরোগ এবং এমনকি ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে । ঢাকাসহ বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দূষিত । এই সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করছে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ।
*নবায়নযোগ্য শক্তি: সবুজ ভবিষ্যতের দিশারী:-*
“পরিষ্কার বায়ুর জন্য নবায়নযোগ্য শক্তি এক সুদূরপ্রসারী সমাধান । সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ এবং বায়োমাস বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় অনেক কম কার্বন নিঃসরণ করে । নবায়নযোগ্য শক্তি পরিবেশের ওপর চাপ কমায়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা করে । এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশের নির্ভরতা কমে আসে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় ।
নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো:
*১) ইলেকট্রিক যানবাহন:* যানবাহনের ধোঁয়ার বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যবহার শহরাঞ্চলের বায়ু দূষণ কমাতে অত্যন্ত কার্যকর । এই যানবাহনগুলো সরাসরি কোনো নিষ্কাশন গ্যাস (exhaust gas) নির্গত করে না। যখন এগুলো সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে চলে, তখন তা সামগ্রিক বায়ুর গুণগত মানকে বহুগুণ উন্নত করে, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটিও দূষণমুক্ত থাকে ।
*২) সৌর প্যানেল:-* ছাদে বা পতিত জমিতে সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে কয়লা বা গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়, ফলে বায়ু দূষণকারী পদার্থের নির্গমনও হ্রাস পায় ।
*৩) বায়ু টারবাইন:* -বায়ু প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, যা পরিবেশকে কোনো দূষণকারী গ্যাস দ্বারা প্রভাবিত করে না ।
*৪) বায়োমাস থেকে পরিচ্ছন্ন শক্তি:-* কৃষিজ বর্জ্য, পশুবর্জ্য বা পৌরসভার বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনে বা রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় । এটি খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকারক ধোঁয়া ও কণা দূষণ কমিয়ে গ্রামীণ ও শহুরে উভয় এলাকার বায়ু মান উন্নত করে ।
*৫) ছাদের বাগান:-* বায়ু দূষণ রোধে এক কার্যকর উদ্যোগ: ছাদে গাছ লাগানো সরাসরি নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস না হলেও এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ । গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন ত্যাগ করে এবং বায়ুতে ভাসমান ক্ষুদ্র কণা আটকে রাখতে সাহায্য করে । এটি শহরের তাপমাত্রা কমিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস করে এবং সামগ্রিকভাবে বায়ুর গুণগত মান উন্নত করে।
*তরুণ সমাজ: পরিবর্তনের চালিকাশক্তি:-*
বায়ু দূষণ রোধে তরুণ সমাজই হতে পারে পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং পরিবেশ সচেতনতা এই ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে । সম্প্রতি শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের Youth for CARE ওয়ার্কশপে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল , যেখানে আমাদের মূল ফোকাসই ছিল নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করা যায় । এই ওয়ার্কশপে আমরা বায়ু দূষণ রোধে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেছি এবং আমাদের দলের মূল লক্ষ্য ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি নির্ভর পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করা ।
আমাদের প্রস্তাবনাগুলো ছিল:
– সৌর বিদ্যুৎ চালিত বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন ব্যবহার।
° শহরাঞ্চলে ছাদে গাছ লাগানো।
° টারবাইন এবং জলবিদ্যুৎ ব্যবহার।
তরুণরা শুধু উদ্ভাবনী প্রকল্প তৈরি করেই থেমে থাকছে না, তারা গণসচেতনতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সেমিনার এবং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে তারা নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব ও এর ব্যবহার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করছে। এটি নবায়নযোগ্য শক্তিকে জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় করতে সাহায্য করবে।
**সবুজ বিশ্বের পথে: সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রয়োজনীয়তা:*
এই সবুজ ও টেকসই উদ্যোগের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নীতিগত সমর্থন অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সর্বস্তরের জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য অর্জনে লক্ষ্যাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষত, নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা, নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, এবং সবুজ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা অপরিহার্য। এছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের বায়ু মান পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণ এবং সবুজ পরিবহন ও ভবন নির্মাণে প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।
লেখক
মাহমুদুল হাসান তাসিন,শিক্ষার্থী,তিতুমীর কলেজ।
Leave a Reply