“শঠিবাড়ী স্কুলে ফলাফল বিপর্যয়: প্রধান শিক্ষকের অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতিতে শিক্ষার্থীদের সর্বনাশ”
ফরিদুল সরকার, রংপুর প্রতিনিধিঃ
২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল শঠিবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে আর ঢেকে রাখতে পারেনি। এই বছর বিদ্যালয়ের ৩১৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছে ৭১ জন। পাশ করেছে মাত্র ২৪৬ জন। পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৭৭.৬৭ শতাংশ, যা উপজেলায় সবচেয়ে নিচে। শুধু তাই নয়, A+ পেয়েছে মাত্র ২৯ জন শিক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৯.১ শতাংশ। আশেপাশের বিদ্যালয়গুলো যখন ৯০-৯৫ শতাংশ পাসের হার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, তখন শঠিবাড়ী স্কুলের এই ফলাফল এলাকাবাসীকে হতবাক ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
স্থানীয় অভিভাবক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের এই পতনের মূল কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অবৈধ নিয়োগ, আর্থিক দুর্নীতি এবং প্রধান শিক্ষকের একচেটিয়া কর্তৃত্ব। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্র নাথ সাহা হারু নিজের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে একের পর এক অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। এইসব নিয়োগের পেছনে ছিল না কোনো স্বচ্ছ পরীক্ষা, মূল্যায়ন কিংবা পরিচালনা কমিটির অনুমোদন। অধিকাংশ নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে ক্লাসে পাঠদানের মান দ্রুত অবনমিত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বাধ্য হচ্ছে শিক্ষকদের পরিচালিত কোচিং সেন্টারে গিয়ে বাড়তি খরচে একই বিষয় আবার শিখতে।
শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, বিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেন নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। দু’বছর আগে বিদ্যালয়ের মূল্যবান গাছ বিক্রির অর্থ প্রধান শিক্ষক আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিক্রির টাকা কোথায় গেল, তার কোনও সঠিক হিসাব বিদ্যালয় ফান্ডে দেখানো হয়নি। এছাড়া এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে তা বিদ্যালয়ের হিসাববহির্ভূতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিভাবকদের অভিযোগ।
বিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তার ওপর নেমে আসে ভয়াবহ প্রতিশোধ। সাংবাদিক জানান, প্রধান শিক্ষকের প্রভাবাধীন একটি ক্যাডার গোষ্ঠী তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। অভিভাবকরা বলছেন, বিদ্যালয়ের এই অবস্থা দেখে হতাশার সীমা নেই। স্কুলের পড়ালেখা এখন নামেমাত্র। শিক্ষকরা কোচিংয়ে সময় দেন বেশি, ক্লাসে কম। প্রশাসন সব জেনেও চুপ রয়েছে। প্রাক্তন ছাত্ররা বলছেন, এই বিদ্যালয় একসময় রংপুর অঞ্চলের গর্ব ছিল। আজ তা লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষ মনে করেন, এই ব্যর্থতার দায় শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, বরং বিদ্যালয় প্রশাসন, উপজেলা শিক্ষা অফিস এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের। এখনই যদি জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে আগামী বছর আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
এলাকাবাসী অবিলম্বে প্রধান শিক্ষককে অপসারণ, অবৈধ নিয়োগ বাতিল, অর্থ আত্মসাৎ তদন্ত ও সাংবাদিক নির্যাতনের বিচার দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, শিক্ষার নামে এই দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ না হলে আগামী প্রজন্ম অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
Leave a Reply