“তারেক রহমানের বেইজিং যাত্রা ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণ”
“নাম:মো:নাঈম আলী
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ (জাবি)”
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের উত্থান, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এই অঞ্চলকে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চীন সফর কেবল একটি রাজনৈতিক সফর নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ, চীনের কূটনৈতিক কৌশল এবং দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি তারেক রহমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বৃহৎ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোর একটি। মালয়েশিয়া সফর শেষে তিনি চীনের দালিয়ানে পৌঁছান, যেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানানো হয়। পরবর্তীতে তার অংশগ্রহণ ছিল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার ডাভোস সম্মেলনে এবং চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে। সফরের আলোচ্যসূচিতে ছিল বিনিয়োগ, অবকাঠামো, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং তিস্তা প্রকল্পের মতো দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭ টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সম্ভাব্য দলিলগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৩ টি সমঝোতা স্মারক (এম ও ইউ),দুটি চুক্তি, একটি ককর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) ও একটি প্রটোকল। তিনি আরও বলেন, সফরকালে তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী (Realist) তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রসমূহ সবসময় নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেয়। আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার চেয়ে কৌশলগত স্বার্থ এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা চীনের জন্য একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক কৌশল। কারণ যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রধান লক্ষ্য।চীন গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়াকে তার বৈশ্বিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। Belt and Road Initiative (BRI)-এর মাধ্যমে বেইজিং শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করেনি; বরং অর্থনৈতিক নির্ভরতা, বাণিজ্যিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানের China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর, নেপালের অবকাঠামো প্রকল্প এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার, আঞ্চলিক বাণিজ্যে করিডোরের সম্ভাবনা এবং দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি দেশটিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে কৌশলগতভাবে মূল্যবান করে তুলেছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চীনের আগ্রহকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
তারেক রহমানের সফরের তাৎপর্য এখানেই। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের সঙ্গে বিদেশি শক্তিগুলোর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, তারা কেবল বর্তমান সরকারের সঙ্গে নয়, বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীজনদের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের আমন্ত্রণ এবং দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের আহ্বানও এই দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন
তবে এই সফরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে এসেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; বরং নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সহযোগিতা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সংযোগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা একটি সংবেদনশীল বিষয়। বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্প, বন্দর উন্নয়ন, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে চীনের সক্রিয়তা ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়াতে পারে। যদিও বাংলাদেশ বারবার বলেছে যে তারা কোনো শক্তি-জোটের অংশ হতে চায় না, তথাপি ভারত-চীন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় ঢাকার প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের “Balance of Power” বা শক্তির ভারসাম্য তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলো সাধারণত কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে? বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন অংশীদার। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, নিরাপত্তা ও সংযোগ সহযোগিতার অন্যতম প্রধান অংশীদার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার পরিবর্তে বহুমুখী কূটনীতি পরিচালনাই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “Hedging Strategy”। এর অর্থ হলো কোনো রাষ্ট্র এককভাবে কোনো একটি শক্তির সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করে। বর্তমানে বাংলাদেশ অনেকাংশে এই কৌশল অনুসরণ করছে। তারেক রহমানের চীন সফরকে এই বৃহত্তর বাস্তবতার আলোকে দেখলে এটি কেবল একটি সফর নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। শ্রীলঙ্কা অতিরিক্ত ঋণনির্ভর অবকাঠামো প্রকল্পের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছিল। নেপাল ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল অনুসরণ করেছে। পাকিস্তান চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুললেও তার নিজস্ব কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশ এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ। কোনো সফরের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় না কতগুলো ছবি তোলা হলো বা কতগুলো যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হলো তার ওপর। বরং নির্ধারিত হয় দেশটি কতটা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারল, কতটা প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করতে পারল, কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা গেল তার ওপর।
তারেক রহমানের বেইজিং সফর তাই দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি দেখিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশ এখন আর কেবল আঞ্চলিক রাজনীতির প্রান্তিক রাষ্ট্র নয়,বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করবে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার ওপর যেমন, তেমনি বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে তার ওপরও।
বেইজিং সফরের প্রকৃত তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সফর নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি।
Leave a Reply