“শিবচরে দুই দিনব্যাপী বিনামূল্যে চক্ষু সেবা ও ছানি অপারেশন ক্যাম্প শুরু: প্রথম দিনেই চিকিৎসা নিলেন শতাধিক মানুষ”
নিজস্ব প্রতিবেদক, শিবচর (মাদারীপুর):
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চোখের আলো ফেরাতে এবং দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে দুই দিনব্যাপী বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা, চিকিৎসাসেবা ও ছানি অপারেশন ক্যাম্পের শুভসূচনা হয়েছে। ক্যাম্পের প্রথম দিনেই শত শত রোগী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি ইউনিয়নের শেখপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সংলগ্ন স্থানে এই জনকল্যাণমূলক ক্যাম্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। প্রথম দিনেই শুধু চক্ষু চিকিৎসার জন্য ৬৪২ জন রোগী নিবন্ধন করেন। পাশাপাশি চর্ম, গাইনি ও মেডিসিনসহ অন্যান্য সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য আরও প্রায় ১২০ জন রোগী নিবন্ধন করে চিকিৎসাসেবা নেন।
সেবা গ্রহণের সময় ও বিবরণ
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট শুরু হওয়া এই চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চলবে আগামী মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে এই সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
ক্যাম্পে আগত রোগীদের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, চোখে তীব্র ব্যথা, চুলকানি, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, ছানি পড়া, চোখের পাতার সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল চক্ষুজনিত রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক মানুষের পাশাপাশি বহু শিশুকে এই ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা নিতে দেখা গেছে।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ
কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, প্রথম দিনে চক্ষু চিকিৎসার জন্য যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে ৫০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যাই তুলনামূলক বেশি। তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে নানা চোখের সমস্যায় ভুগলেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে এতদিন কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেননি। বিনা মূল্যে এমন একটি সেবাম পেয়ে তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
খ্যাতিসম্পন্ন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও ফ্যাকো সার্জন অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নানের তত্ত্বাবধানে ও দিকনির্দেশনায় রোগীদের এই চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বর্তমানে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ, ডায়াবেটিক রেটিনা ও ফ্যাকো সার্জন হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে রোগীরা উচ্চমানের চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।
ছানি অপারেশন ও অন্যান্য উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এলাকার বহু দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে সময়মতো চোখের ছানি বা অন্যান্য জটিল রোগের অপারেশন করাতে পারেন না। সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ লাঘবের জন্যই এই মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
দুই দিনব্যাপী এই ক্যাম্পে যেসব রোগীর ছানি অপারেশনসহ উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হবে, তাদের তালিকাভুক্ত ও বাছাই করা হবে। পরবর্তীতে আগামী ১৯ আগস্ট মাদারীপুর শহরের কলেজ রোডে অবস্থিত প্ল্যানেট হাসপাতালে তাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অস্ত্রোপচার ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের বিনামূল্যে ছানি অপারেশন, চোখে লেন্স সংযোজন, গাইনি চিকিৎসাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের থাকা ও খাওয়ার সম্পূর্ণ খরচ প্ল্যানেট হাসপাতালের পক্ষ থেকে বহন করা হবে বলে আয়োজকরা নিশ্চিত করেছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও অতিথিবৃন্দ
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবক ও সাত্তার জুট অ্যান্ড ফাইবার্সের স্বত্বাধিকারী আলহাজ্ব লোকমান মোল্লা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হুমায়ুন কবির, মাদারীপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু বকর সিদ্দিকীর জ্যেষ্ঠ কন্যা রোজিনা সিদ্দিকী সোমা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শাহাদাত হোসেন হাওলাদার, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজান শিকদার এবং জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট অহিদুজ্জামান খানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আলহাজ্ব লোকমান মোল্লা বলেন, “আমি কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জনসেবা করছি না। মহান আল্লাহ আমাকে মানুষের সেবা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। তাই আমার দায়িত্ব, কর্তব্য ও ভালোলাগা থেকেই আমি সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চাই।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আজ ও আগামীকাল এই ক্যাম্প থেকে যাদের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হবে, তাদের মাদারীপুরের প্ল্যানেট হাসপাতালে বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশন, লেন্স সংযোজন, গাইনি চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। তাদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থাও প্ল্যানেট হাসপাতালের পক্ষ থেকে করা হবে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
আয়োজকরা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এলাকার কোনো দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যেন আর অর্থের অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে অন্ধত্ব বা কষ্ট বরণ না করে, সেই লক্ষ্যেই এই ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও রোগীরা এমন মহতী উদ্যোগের জন্য আয়োজকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম নিয়মিত অব্যাহত রাখার জোরালো প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
Leave a Reply