বর্ষাবাস শেষে দান-পুণ্য ও প্রার্থনায় উৎসবমুখর খাগড়াছড়ি; বিহারে বিহারে পুণ্যার্থীদের সমাগম।
খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি।
পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসছে ধর্মীয় প্রার্থনার সুর। বিহার প্রাঙ্গণে জ্বলছে প্রদীপ, ফুলে ফুলে সাজানো হয়েছে বুদ্ধমূর্তি। কারও হাতে দানের সামগ্রী, কেউ নিবিষ্ট মনে প্রার্থনায়। অতীতের ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধি আর জগতের সকল প্রাণীর সুখ-শান্তি কামনায় পুণ্যকর্মে মগ্ন উপাসক-উপাসিকারা। এমন ধর্মীয় আবহে উৎসবমুখর পরিবেশে খাগড়াছড়িতে উদযাপিত হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা।
রোববার সকাল থেকে দিনব্যাপী খাগড়াছড়ি জেলা সদরের পেরাছড়াস্থ ধর্মপুর আর্য্য বন বিহার, পানছড়ি অরণ্য কুটিরসহ জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নানা ধর্মীয় আচার ও পুণ্যানুষ্ঠান। বুদ্ধমূর্তি দান, সংঘদান, অষ্ট উপাচার দান ও হাজার প্রদীপ দানসহ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করছেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা।
প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা ও কল্যাণের এক বিশেষ উপলক্ষ। তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে এই পূর্ণিমার মধ্য দিয়ে ভিক্ষুসংঘের বর্ষাবাস সমাপ্ত হয়। ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে উপাসক-উপাসিকারাও এদিন নানা পুণ্যকর্মে অংশ নেন।
জেলা সদরের ধর্মপুর আর্য্য বন বিহারে সকাল থেকেই ছিল পুণ্যার্থীদের সমাগম। বুদ্ধমূর্তির সামনে ফুল নিবেদন, দান-দক্ষিণা, ধর্মীয় প্রার্থনা ও ধর্মদেশনা ঘিরে বিহার প্রাঙ্গণে তৈরি হয় এক পবিত্র ও উৎসবমুখর পরিবেশ। দিনব্যাপী আয়োজনে অংশ নিয়ে বুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তি, মৈত্রী ও সম্প্রীতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ভক্তরা।
ধর্মপুর আর্য্য বন বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভদ্দজী মহাস্থবির প্রধান ধর্মদেশনা প্রদান করেন। এ ছাড়া উপাসক-উপাসিকাদের উদ্দেশ্যে ধর্মদেশনা করেন শ্রীমৎ দীপানন্দ স্থবিরসহ আরও অনেকে।
ধর্মপুর আর্য্য বন বিহারের সাধারণ সম্পাদক পূর্ণেন্দু বিকাশ দেওয়ান বলেন, “ভান্তেদের দীর্ঘ তিন মাস বর্ষাবাসের পর প্রবারণা পূর্ণিমার মধ্য দিয়ে বর্ষাবাস শেষ হয়। প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আমরা অতীতের ভুল-ত্রুটির জন্য বুদ্ধের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। এখন থেকে বিভিন্ন বিহারে এক মাসব্যাপী অন্যতম ধর্মীয় উৎসব কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠিত হবে।”
তাঁর কথায় উঠে আসে প্রবারণা পূর্ণিমার ধর্মীয় তাৎপর্য ও আত্মশুদ্ধির বার্তা। বর্ষাবাস শেষে এই উৎসব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য নতুন করে ধর্মীয় অনুশীলন, আত্মসমালোচনা ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।
প্রবারণা পূর্ণিমার পুণ্যানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া উপাসক আকাশী চাকমা বলেন, “প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আমরা সকাল থেকে বুদ্ধমূর্তি দান, সংঘদানসহ নানা ধরনের দান করে থাকি। পাশাপাশি জগতের সকল প্রাণীর সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করি।”
উপাসক ত্রিনা চাকমা বলেন, “প্রবারণা পূর্ণিমা আমাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এদিন আমরা বুদ্ধের আদর্শ অনুসরণ করে নিজেদের ভুল-ত্রুটি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করি। দান, প্রার্থনা ও ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজের এবং সকল প্রাণীর কল্যাণ কামনা করি।”
উপাসক চম্পানন চাকমা বলেন, “প্রবারণা পূর্ণিমা আমাদের ধর্মীয় জীবনে নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে আমরা শান্তি, মৈত্রী ও সম্প্রীতির শিক্ষা গ্রহণ করি। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, শান্তিতে থাকুক—এটাই আমাদের প্রার্থনা।”
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দান, শীল ও ভাবনার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রীভাব জাগ্রত করাই ধর্মীয় জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই প্রবারণা পূর্ণিমার আনুষ্ঠানিকতা শুধু বিহারকেন্দ্রিক নয়; এর মধ্য দিয়ে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, ক্ষমাশীলতা ও শান্তির বার্তাও ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে, উৎসবটি যাতে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়, সে লক্ষ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। খাগড়াছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কায় কিসলু বলেন, “বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যেন উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য পুলিশ সবসময় নিরাপত্তায় মাঠে থাকবে।”
প্রবারণা পূর্ণিমার মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে তিন মাসের বর্ষাবাস। এরপরই বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে শুরু হবে মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান উৎসব। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ ধর্মীয় আয়োজন ঘিরে পাহাড়ের জনপদে তৈরি হবে নতুন করে উৎসবের আবহ।
প্রবারণা পূর্ণিমার এই পুণ্যক্ষণে বুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও কল্যাণের বন্ধন আরও দৃঢ় হোক,এমন প্রত্যাশা খাগড়াছড়ির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের।
খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক
,খাগড়াছড়ি
Leave a Reply