মানিকগঞ্জে নীলাচল পরিবহনে চাঁদাবাজির অভিযোগ, কাদের কাছে জিম্মি পরিবহন মালিক!
মাহাবুব আলম তুষার
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
ঢাকা আরিচা মহাসড়কে চলাচলকারী নীলাচল পরিবহনে জিপি ও অন্যান্য খাতের নামে অর্থ আদায় নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। পরিবহনটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো: মাসুদ হোসেনকে ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি মানিকগঞ্জের বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ডে প্রতিটি গাড়ি থেকে নতুন করে ১০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন পরিবহনটির কয়েকজন মালিক। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে নীলাচল পরিবহনের ১৩০টির বেশি বাস চলাচল করে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার মালিকদের রয়েছে ৭০টির বেশি বাস। পরিবহন পরিচালনা ও রুট ব্যবস্থাপনার নামে আগে পাটুরিয়া ঘাট এলাকা থেকে প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে দৈনিক ১ হাজার ২৫০ টাকা আদায় করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মালিক। তাঁদের দাবি, বর্তমানে স্থান পরিবর্তন করে ঢাকা এলাকায় এ অর্থ আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
নতুন করে মানিকগঞ্জের বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ডে প্রতিটি গাড়ি থেকে ১০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে মনো ও সবুজ নামের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। পরিবহনটির কয়েকজন মালিকের অভিযোগ, তাঁরা এমডি মো:মাসুদ হোসেনের পরিচালিত ব্যক্তি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নীলাচল পরিবহনের কয়েকজন মালিক জানান, পরিবহন পরিচালনা, রুট পারমিট ও জিপির নামে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, আদায় করা অর্থের সামান্য অংশ পরিবহন খাতে ব্যয় হয় বাকি অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব তাঁদের কাছে নেই। রাজনৈতিক মহলে অর্থ যাওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
পরিবহন মালিকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১২০টি গাড়ি থেকে প্রতিদিন ১ হাজার ২৫০ টাকা করে আদায় হলে দৈনিক মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ৩০ দিনে এর পরিমাণ ৪৫ লাখ টাকা। একইভাবে প্রতিটি গাড়ি থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০০ টাকা আদায় করা হলে ১২০টি গাড়িতে দৈনিক ১২ হাজার টাকা এবং ৩০ দিনে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা হয়।
পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, কেউ এসব অর্থ আদায়ের প্রতিবাদ করলে তাঁর বাস মহাসড়কে চলাচল করতে দেওয়া হবে না এমন আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেক মালিক বাধ্য হয়ে টাকা দিচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, একদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও পরিচালন ব্যয়, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে অর্থ পরিশোধের চাপ সব মিলিয়ে পরিবহন ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মালিকদের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের জীবিকাও সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জে নীলাচল পরিবহনের অর্থ আদায়ের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাবেক মালিক সমিতির নেতা মো: ফজলুর নাম উঠে এসেছে। এ ছাড়া পাটুরিয়া ঘাটের কাউন্টার সুপারভাইজার মো:সুজনের নামও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গণমাধ্যমকর্মী বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ডে গেলে সেখানে অর্থ আদায়ের দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করা হয় বলে জানা গেছে। এ সময় মনো মিয়ার কাছে টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে উদ্ধত আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা মালিক সমিতির সভাপতি ও জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক লিটনকে অবহিত করা হলে তিনি বলেন, বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ডে টাকা তোলার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মালিকপক্ষ ও এমডি ভালো বলতে পারবেন। যদি এ রকম কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নীলাচল পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো:মাসুদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন থেকে জিপি বা গেট পাসের নামে অর্থ আদায়ের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোনো পরিবহন সমিতি বা প্রতিষ্ঠান বৈধ চুক্তি, অনুমোদিত ব্যবস্থা কিংবা সম্মতিভিত্তিক পরিচালন ব্যয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। তবে শুধু জিপি নাম ব্যবহার করলেই অর্থ আদায় বৈধ হয়ে যায় না। অর্থ আদায়কারীর আইনগত ক্ষমতা, অনুমোদন, আদায়ের উদ্দেশ্য, রসিদ এবং অর্থের হিসাব যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৮৩ ধারায় ভয়ভীতি বা ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি করে অসৎ উদ্দেশ্যে কাউকে সম্পত্তি বা অর্থ দিতে বাধ্য করার বিষয়টি চাঁদাবাজি হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। ৩৮৪ ধারায় চাঁদাবাজির শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। ঘটনার ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ডবিধির অন্যান্য ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে।
এ ছাড়া সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩৮(৩) ও ৮৩ ধারার প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ঘটনায় কোন আইন ও ধারা প্রযোজ্য হবে, তা অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ এবং আইনের শর্তের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
পরিবহন মালিকদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অর্থ আদায়ের অনুমোদনপত্র, রসিদ, হিসাব এবং অর্থের ব্যবহার যাচাই করার দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, জিপি ও অন্যান্য খাতের নামে অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বচ্ছভাবে যাচাই করা না হলে মহাসড়কে পরিবহন পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, যাত্রী ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং আইনবহির্ভূত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে অর্থ আদায়ের বৈধতা ও হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী মালিকেরা। তাঁদের মতে, পরিবহন খাতে বৈধ পরিচালন ব্যয় থাকলে তার স্বচ্ছ হিসাব থাকতে হবে আর জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের প্রমা
Leave a Reply