মৌলভীবাজারে প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক জসিম উদ্দিন বরখাস্ত।
রিপন কান্তি ধর, জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে কর্মক্ষেত্রের শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামনেই এক প্রধান শিক্ষকের ওপর অতর্কিত হামলা ও মারধরের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। সরকারি দপ্তরের ভেতরে ঢুকে এই বর্বর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কাজী নাদিমুল হকের নিজ অফিস কক্ষে এই অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। আহত শিক্ষকের নাম মিঞা মোহাম্মদ শহীদুল রহমান। তিনি উপজেলার দামিয়া আদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত মো. জসিম উদ্দিন একই উপজেলার মিঠারাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
প্রত্যক্ষদর্শী ও অফিস আদেশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন বিকেলে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কাজী নাদিমুল হকের কক্ষে দাপ্তরিক কাজে অবস্থান করছিলেন প্রধান শিক্ষক মিঞা মোহাম্মদ শহীদুল রহমান। এ সময় সহকারী শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন আকস্মিক ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি প্রধান শিক্ষককে লক্ষ্য করে উগ্র ভাষায় বলেন, “আমি স্কুলে যাই বা না যাই তাতে তুই দেখার কে?”—এই কথা বলেই তিনি চড়াও হন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রধান শিক্ষকের ওপর এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড়, কিল, ঘুষি ও লাথি মারতে থাকেন। হামলায় প্রধান শিক্ষক রক্তাক্ত অবস্থায় অফিস কক্ষের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। কক্ষে উপস্থিত সহকারী শিক্ষা অফিসারসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অভিযুক্ত শিক্ষক দ্রুত মোটরসাইকেলযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
ননাক্রমিক ও নজিরবিহীন এই ঘটনার খবর পেয়ে আহত প্রধান শিক্ষককে দেখতে দ্রুত মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ছুটে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাজিব হাসান। তিনি এ ধরনের আচরণকে অত্যন্ত দুঃখজনক, অগ্রহণযোগ্য ও শৃঙ্খলাবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রাশিদা আক্তার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সরকারি দপ্তরে ঢুকে একজন প্রধান শিক্ষকের ওপর এমন হামলা পুরো শিক্ষক সমাজ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রতি এক চরম আঘাত। ঘটনাটির পরপরই তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের দপ্তরে সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল।
সরকারি দপ্তরের প্রশাসনিক কক্ষে সংঘটিত এমন ন্যক্কারজনক ঘটনায় মৌলভীবাজারের সচেতন মহল ও স্থানীয় শিক্ষক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষিতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আনিছুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে অভিযুক্ত শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিনকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী এটি একটি শাস্তিযোগ্য অসদাচরণ। তাই বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা প্রয়োজন ও সমীচীন মর্মে প্রতীয়মান হয়। একই বিধিমালার বিধি ১২(১) ক্ষমতাবলে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়। বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোশ ভাতা প্রাপ্য হবেন।
Leave a Reply