“গাজায় ভয়াবহ তাপদাহে চর্মরোগের বিস্তার, হাসপাতালে জ্বালানি সংকট”
সালমান ইমন: কমলনগর (লক্ষীপুর) প্রতিনিধি
গাজা উপত্যকা আজ এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। একদিকে অস্বাভাবিক তাপদাহ, অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানির ভয়াবহ ঘাটতি সব মিলিয়ে লাখো ফিলিস্তিনির জীবন অমানবিক যন্ত্রণায় অন্ধকারে ডুবে গেছে।
আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবু সালমিয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ভয়াবহ তাপমাত্রা ও পানির সংকটের কারণে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষ দ্রুত চর্মরোগ, পানিশূন্যতা ও নানা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং একটি পরিকল্পিত গণবিধ্বংসী অবরোধ। দখলদার ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে গাজার হাসপাতালগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে গেলে অক্সিজেন, ইনকিউবেটর বা আইসিইউ সবকিছু থেমে যাবে, আর তাতে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর মুখে পতিত হবে। গাজার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি না থাকায় হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার, ডায়ালাইসিস মেশিন, শিশু ইনকিউবেটর, এমনকি স্যালাইনের কুলিং সিস্টেম পর্যন্ত চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
ডা. মোহাম্মদ আবু সালমিয়া অভিযোগ করেন, ইসরায়েলি বাহিনী এখনো স্কুল, হাসপাতাল এবং আশ্রয়কেন্দ্রে নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করছে। তারা জানে এইসব স্থানে নিরস্ত্র নারী, শিশু ও বৃদ্ধ আশ্রয় নিয়েছে। তবুও তারা হামলা চালাচ্ছে এটি স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধ এবং পরিকল্পিত গণহত্যা। ডা. মোহাম্মদ আবু সালমিয়ার কণ্ঠে ছিল বেদনাভরা সতর্কবার্তা। গাজার মানবিক বিপর্যয় প্রতিদিন আরও গভীর হচ্ছে। যদি অবরোধ ও হামলা বন্ধ না হয়, তবে এটি এক অনির্বচনীয় গণবিধ্বংসে পরিণত হবে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান উপেক্ষা করে দখলদার ইসরায়েল বাহিনী গাজায় অবিরাম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ হাজার এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
গত নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োআভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দখলদার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলছে। তবুও দখলদার বাহিনী তাদের নৃশংসতা বন্ধ করেনি, বরং আরও নির্মম হয়ে উঠেছে।
আজ গাজা উপত্যকা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অবরোধ ও গণহত্যার সাক্ষী। কোটি কোটি মানুষ চোখের সামনে শিশুদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও বোমার আগুনে পুড়ে মরতে দেখছে কিন্তু বিশ্ব নীরব। এই ভূমি শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের অংশ যেখানে মসজিদুল আকসার মিনার আজও আকাশের দিকে তাকিয়ে ন্যায়বিচারের জন্য প্রার্থনা করছে। কোটি কোটি মানুষ চোখের সামনে নিরপরাধ শিশুদের ক্ষুধায় কাতরাতে, তৃষ্ণায় অজ্ঞান হতে, আর দখলদারদের বোমার আগুনে ছিন্নভিন্ন হতে দেখছে, তবুও বিশ্বশক্তিগুলো নীরব, যেন তাদের হৃদয় পাথরে পরিণত হয়েছে। এ নীরবতা সমগ্র মানবতার জন্য এক কলঙ্ক, যা ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা থাকবে।
Leave a Reply