“প্রকৃতিকন্যা বাকৃবি: ৬৫ বছরের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের যাত্রা”
বাকৃবি প্রতিনিধি –
ময়মনসিংহের বুক চিরে বয়ে চলা প্রাচীন ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরে বিস্তৃত সবুজ-শ্যামল প্রান্তর। তারই কোলে দাঁড়িয়ে আছে এক স্বপ্নপুরী, এক আলোকদ্বীপ- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। গ্রামবাংলার প্রাণ-প্রকৃতি, কৃষকের ঘাম ও মাটির গন্ধে ভরা এই ক্যাম্পাস যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক কাব্য। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ইতিহাসে যার অবদান নদীর জলের মতোই অবিরাম, স্থির অথচ প্রাণময়। আজ এই বিশ্ববিদ্যালয় ৬৫ বছরে পা রাখল, এ যেন মাটির সন্তানদের সংগ্রামী যাত্রার গৌরবময় মাইলফলক।
১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট। ১২শ একর জমির ওপর ব্রহ্মপুত্রের কোলঘেঁষে জন্ম নেয় কৃষিবিদ তৈরির এই স্বপ্নসিঁড়ি। ৬টি অনুষদ ও ৪৬টি বিভাগ নিয়ে যা আজ বিশ্বমানের গবেষণালয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি মোট ৫৭ হাজার ৮শ ৯ শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি দিয়েছে। যাদের মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারী ৩২ হাজার ৯শ ১৭ জন, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ২৩ হাজার ৮শ ৪৩ জন, পিএইচ.ডি ডিগ্রিধারী ১ হাজার ৪৯ জন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। আর তাঁদের পথপ্রদর্শক আছেন ৫শ ১৪ জন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের পথ সুগম করতে এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার যার বর্তমান সংগ্রহ সংখ্যা- পুস্তক ২ লক্ষ ৩১ হাজার ৯শ ৭২ ভলিউম (২২ হাজার ৬শ ১৬ টি থিসিস এবং ৪৭ হাজার ৬১ ভলিউম বাধাইকৃত সাময়িকী), ই-বুকস ৪১শ’টি টাইটেল এবং বিভিন্ন অনলাইন জার্নাল প্লাটফর্ম (যেমন- LiCoB, BIPC, Research4life, AGORA, HINARI, OARE, ARDI, GOALI, UDL, BANGLAJOL)। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য বর্তমানে রয়েছে মোট ১৪ টি হল। ছেলেদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে ৯টি ও মেয়েদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে ৫ টি। এছাড়াও মেয়েদের জন্য আরও ২টি হল নির্মাণধীন রয়েছে।
শুধু সংখ্যা নয়, স্বপ্নের মাপকাঠিই হলো আসল গুণমান। তাই শিক্ষা ও গবেষণার মানদণ্ডে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে বাকৃবি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ (টিএইচই) ২০২৫ সালের এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ৪০১-৫০০ এর মধ্যে অবস্থান করছে বাকৃবি। ওয়েবমেট্রিক্সের সাম্প্রতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম, দেশের পাবলিক-প্রাইভেট সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নবম, আর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ২৩২৩তম অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে এই শিক্ষাঙ্গন।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে কৃষিবিজ্ঞান ও গবেষণার উর্বর ক্ষেত্র। কৃষির প্রতিটি ধাপে আছে তাঁদের হাতের স্পর্শ। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ, লবণাক্ত সহিষ্ণু ধান, খরা সহিষ্ণু ফসল, উচ্চফলনশীল জাত, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, প্রাণিজ ভ্যাকসিন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, এসবই বাকৃবির অবদান।
গবেষণাগারে জেগে ওঠা অসংখ্য উদ্ভাবনের মধ্যে আছে বাউধান-৬৩, বাউধান-২, বাউধান-৩; বাউকুল ‘সম্পন্ন’ ও ‘সম্বল’; শর্ষের জাত বাউ-এম/৩৯৫, বাউ-এম/৩৯৬, অল্টারনারিয়া ব্লাইট প্রতিরোধী বাউ শর্ষে-৪, ৫, ৬। আছে সয়াবিনের জাত ‘ডেভিস’, ‘ব্র্যাগ’, ‘সোহাগ’ ও ‘বিএস-৪’; আলুর জাত ‘কমলা সুন্দরী’ ও ‘তৃপ্তি’; কচুরমুখি ‘লতিরাজ’, ‘বিলাসী’, ‘দৌলতপুরী’; মিষ্টি আলুর তিনটি উন্নত জাত। আছে সৌরতাপে বীজ রোগনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, শুকনো পদ্ধতিতে বোরো চাষ, অ্যারোবেক প্রযুক্তি, রাইজোবিয়াল জৈব সার,মাটি ও পানিতে ব্যবহারযোগ্য পরিবেশবান্ধব ছত্রাকনাশক ও সয়েল টেস্টিং কিট।
প্রাণিসম্পদ খাতে এসেছে যুগান্তকারী সাফল্য। প্রাণিসেবা সহজ করতে তৈরি হয়েছে মোবাইল অ্যাপ: ‘ডিজিটাল খামারি’। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউক্যাসলের ভ্যাক্সিন, গবাদিপশুর ম্যাসটাইটিসের ভ্যাক্সিন, ব্রুসেলা ভ্যাক্সিন, ফাউল কলেরার ভ্যাক্সিন, উন্নতজাতের পশুপাখি, প্রোবায়োটিক খাদ্য, ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন, ক্লোনিং প্রযুক্তি -সবই বাকৃবি গবেষকদের মেধার অবদান।
মৎস্য খাতেও সাফল্যের ব্যাপক সমারোহ রয়েছে। দেশি মাছের কৃত্রিম প্রজনন, হাইব্রিড তেলাপিয়া ও মাগুর, খাঁচায় মাছ চাষ, ধানখেতে মাছ চাষ, মাছের জিনোম সিকোয়েন্স, পোনার ব্ল্যাক সোলজার খাদ্য প্রযুক্তি-সবই কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
Leave a Reply