“প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আইলার কথা স্মরণ করে অঝোরে কাঁদলেন সন্তান ও স্ত্রী হারানো শওকত।
মোহাম্মাদ রহমাতুল্লাহ, খুলনা শহর প্রতিনিধি।
মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, নদীতে ভরা জোয়ার, ১০ নম্বর সতর্ক সংকেত। কেউ ব্যস্ত ঘরের চৌচালা দড়িতে বাঁধতে, কেও শুকনো খাবার ও মোমবাতি গুছিয়ে রাখতে। চারিদিকে পানিতে টইটম্বুর, যতদূর চোখ যায় শুধু পানির স্রোত। ঘরগুলো ভেঙে পড়েছে এবড়োখেবড়ো ভাবে। চারিদিকে চিৎকার এবং হাহাকার। হাড়ি ভর্তি ভাত ভেসে যাচ্ছে। গবাদি পশু জীবীত এবং মৃত ভেসে যাচ্ছে চোখের সামনে। সবকিছু দেখেও যেন নির্বাক দর্শক। নিজের এবং পরিবারের চিন্তা ছাড়া কোনো চিন্তাই যেন মাথায় আসছেনা।
এভাবে একের পর এক ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আইলার স্মৃতিগুলো বর্ণনা করছিলেন সন্তান এবং স্ত্রী হারানো শওকাত হোসেন, বিলের পানিতে ভেসে যাওয়া মঞ্জুরুল ইসলাম ও ৪৫ বছর বয়সী ছকিনা খানম।
মদিনাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পিছনে ঘোষ ডেয়ারী এবং ভাজাপোড়ার দোকান ছিলো শওকত হোসেনের। খুব কষ্টে বাড়ির রাস্তায় পৌঁছায় শওকত। তখন বাজে ৩টা, বাড়িতে মোবাইল ফোন নাই। বাড়ি ঠিক বিলের মধ্যখানে। মফিদ ঢালীর বাড়ির ভিতর দিয়ে যেতে হয় শওকতদের বাড়ি। শওকতদের ঘর ছিলো মাটির দেয়ালের, গোলপাতার ছাউনি, ঘরের ছিল বেশ উঁচু। মফিদ ঢালীর স্ত্রী শওকতকে বলল, ‘এখনোতো তোমার ঘর পড়ে যায় নি। তুমি এখানে থাকো পানির স্রোত কমলে, বাড়ি গিয়ে ওদের নিয়ে স্কুলে যেও।’
শওকত হোসেন বলেন, “আমি বাড়ির দিকে তাকিয়েই আছি। সন্ধ্যা নামলো, চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমার বড় মেয়ে কুলসুম, মেঝো মেয়ে রুবিনা এখানে (মফিদ ঢালীর বাড়িতে) এসে বলল,‘আব্বু! আম্মু এবং ছোট আপু এজাগায় আসতে যেয়ে পানিতে ভেসে গেছে।”
সেদিনেই স্ত্রী এবং সন্তানকে হারান শওকত হোসেন। খালের এপারে দক্ষিণ মদিনাবাদ ওপারে ২ নং কয়রা। ২নং কয়রা মোবারক মোল্লার বাড়িতে ভাসমান অবস্থায় লাশ মিললো শওকত হোসেনের স্ত্রীর। তার আড়াই বছর বয়সী মেয়ে মিনারার সন্ধান তখনও পাওয়া যায়নি। মানুষজন বাড়ি ফেরার পথে দক্ষিণ মদিনাবাদের আইয়ুব মোল্লার ইটের পাঁচিলের পাশে মৃত অবস্থায় দেখতে পায় মিনারাকে।
শওকত হোসেন বলেন, ঐ রাতেই ঝড় কিছুটা থামলে আমি কিছু সময় স্ত্রী ও সন্তানের খোঁজে বের হই। টেনশনে সারারাত কাটে। সকালবেলা খোকন মোল্লা আমাকে ডেকে বলে, ‘দুলাভাই বু (বোন) কে পেয়েছি, আমি সাতরিয়ে তাকে নিয়ে আসি।’ আমার ছোট মেয়ে মিনারা বয়স দুই বছর ছয়মাস তাঁকে খুজতে শুরু করি। দক্ষিণ মদিনাবাদের পার থেকে সুজাউদ্দিন মোল্লা আমাকে ডেকে বলে, ‘তোমার মেয়েকে পেয়েছি।’
শওকত বলেন, ‘আমার মেয়ে মিনারাকে ওর মা হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বুকে আকড়ে ধরেছিলেন। কেননা আমার স্ত্রীকে পেয়েছিলাম বাচ্চাকে যেভাবে আমরা বুকে জড়িয়ে ধরে রাখি, হাতদু’টো সেভাবেই ছিলো।’
আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে পানির স্রোতে ভেসে যায় মঞ্জুরুল, তার মা ও বাবা। তার বাবা মহসীনের কাছে হ্যাচারি পলিথিনে পেঁচানো ৫০ হাজার টাকা ছিলো সেটিও পানিতে ভেসে চলে যায়। পানিতে ভেসে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে মঞ্জুরুল বলেন, ‘আব্বুর দম শেষ প্রায়। আব্বু তখন আমাকে একটি চুমু দিয়ে বলল, যাও আব্বু! আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখে তবে দেখা হবে।’ কিন্তু তার মা ভেসে গেল পানির স্রোতে। বাপ-বেটা রাতে কয়রা মদিনাবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রে রাত যাপন করে।
মায়ের কথা বলতে গিয়ে মঞ্জুরুল বলেন, আম্মু খুব কষ্টে সাঁতরিয়ে হিন্দু পাড়া পর্যন্ত গেলে সেখানে একটি কুটুগাদা এবং কাঠের স্তূপ পায়। তাতে ভাসতে থাকে, একপাশে পদ্মগোখরা সাপ অন্যপাশে আম্মু। খুব কাছাকাছি সেই সাপ, একটি বারের জন্যও ফোঁস করে উঠিনি। আম্মু ভেসেই যাচ্ছে। ভাসতে ভাসতে কয়রা উপজেলা পরিষদের পাশ দিয়ে যাচ্ছে প্রাণে বাঁচার জন্য। রাত তখন ৮টা বোধহয়। উপজেলা পরিষদের আশ্রয় নেওয়া কয়েকজনের মধ্যে একজন লাইট জ্বালাতেই আম্মুকে দেখতে পেলে তাঁকে খুব কষ্টে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন ১২টা। ছকিনা খানম সাঁকো পেরিয়ে খালের ওপারে দোকানে ঝাল,পেঁয়াজ, রসুন ও কেরোসিন আনতে গেছিলেন। পথিমধ্যে ময়না নামের একজন তাঁকে বলে, ‘দ্রুত বাড়ি যাও, ঘটি-বাটি গোছাও, হরিণ খোলার ওয়াপদা ভেঙে নদীর পানি আসা শুরু করেছে।’ বাড়িতে এসে কোনমতে ভাত তরকারি রান্না শেষ করলেন। বাইরে দেখি খাল দিয়ে ওয়াপদা ভেঙে পানি আসছে প্রবলবেগে। সময় যতই বাড়ছে বাতাসের গতিবেগ ততই বাড়ছে, বাড়ছে পানির স্রোত। বাজার থেকে মাইকে ঘোষণা আসছে ‘কেও আর দেরি করবেন না, এখনই আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যান।’ মেঝো ছেলে মারূফ তখন উত্তরচক কামিল মাদ্রাসায় পড়ে, কাছে ফোন নেই। বেঁচে আছে নাকি, কিভাবে কোথায় আছে জানি না। সকালে দেখি মারূফ বাড়িতে এসে হাজির। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম। এভাবে আবেগীমন মন নিয়ে বলছিলেন ছকিনা খানম।
‘আইলার স্মৃতিগুলো এখনও আমাকে তাড়া করে। আমরা টেকশই বেড়িবাঁধ চাই। গাছ লাগাই, বেশ মোটাসোটা হয়ে ওঠে, তখনই আবার আইলা, আম্ফান ও বুলবুলিরমত ঝড়ে জলোচ্ছ্বাসের কারণে গাছগুলো মরে যাই।’ বলছিলেন সরকারি ব্রজলাল কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আসমাতুল্লাহ।
Leave a Reply