“রাজনীতি: বেঁচে থাকার ভাষা না ক্ষমতার খেলা”
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় আগ্রহের জায়গা কেন রাজনীতি?
বাংলাদেশে রাজনীতি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নয়; এটি এখন সমাজজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, মানুষের বেঁচে থাকার কৌশল, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক এবং ক্ষমতার কল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। দেশজুড়ে চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস—সবখানেই রাজনীতি আলোচনার প্রধান বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন রাজনীতি এই সমাজে এতটা গুরুত্বপূর্ণ, অথচ প্রায়ই এত বিভ্রান্তিকর?
রাজনীতি: রাষ্ট্র নয়, জীবনের অংশ
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনে রাজনীতি কেবল ভোট বা দলীয় কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জীবনের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।
গ্রামে একজন কৃষক থেকে শুরু করে শহরের একজন চাকরিজীবী—প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে “রাজনৈতিক ছায়ায়” থাকতে চায়। কারণ, রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় বিচার-বিবাদ, প্রশাসনিক সুবিধা, এমনকি সামাজিক নিরাপত্তারও নিশ্চয়তা দেয়।
এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, রাজনীতি এখানে শুধু মতাদর্শ নয়, বরং টিকে থাকার একধরনের সামাজিক বীমা।
প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা ও রাজনীতির বিকল্পহীনতা
বাংলাদেশে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য—কোনো প্রতিষ্ঠানই পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়।
যখন রাষ্ট্রের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে “ন্যায়বিচারের বিকল্প পথ।”
মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে ন্যায্য অধিকার বা সুযোগ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
ফলে রাজনীতিতে আগ্রহ জন্মায় ভয়ের, প্রয়োজনের এবং নিরাপত্তার সংমিশ্রণে।
ক্ষমতার কল্পনা ও অংশগ্রহণের আনন্দ
রাজনীতি মানুষের মধ্যে একধরনের মানসিক তৃপ্তি তৈরি করে।
একজন সাধারণ ভোটারও মনে করেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ।
এই ধারণা মানুষকে মনে করায়—সে প্রভাবশালী, সে গুরুত্বপূর্ণ।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি “অংশগ্রহণের আনন্দ” — যেখানে মানুষ ক্ষমতা না থাকলেও ক্ষমতাসীন হওয়ার অনুভূতি পায়।
এভাবেই রাজনীতি হয়ে ওঠে মানসিক নিরাপত্তার আশ্রয়।
ইতিহাসের প্রভাব: রাজনীতি মানেই আন্দোলন ও পরিবর্তন
বাংলাদেশের ইতিহাস রাজনীতির ইতিহাস।
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন—সব কিছুর শিকড়েই ছিল রাজনৈতিক চেতনা।
তাই রাজনীতি এখানে শুধু ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং সংগ্রামের স্মৃতি ও পরিবর্তনের স্বপ্ন।
এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার মানুষকে রাজনীতির প্রতি আবেগী করে তুলেছে।
রাজনীতি তাই একদিকে গৌরবের ইতিহাস, অন্যদিকে আশার প্রতিচ্ছবি।
রাজনীতি বনাম রাজনীতিবিদ: স্বার্থের বিভ্রান্তি
বর্তমান সময়ে রাজনীতি বোঝার চেয়ে রাজনীতি থেকে “লাভবান হওয়ার” প্রবণতা বেড়েছে।
অনেকে রাজনীতিতে আসে ক্ষমতা, চাকরি বা প্রভাব পাওয়ার আশায়। আবার অনেকে সক্রিয় রাজনীতিতে না থেকেও দলীয় ছায়ায় থাকতে চায়, যেন বিপদের সময় আশ্রয় মেলে।
ফলে রাজনীতি জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে পরিণত হয়।
এখানেই রাজনীতি ও রাজনীতিবিদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়—রাজনীতি জনগণের জন্য, কিন্তু রাজনীতিবিদ প্রায়ই নিজের স্বার্থে তা ব্যবহার করেন।
রাজনৈতিক শিক্ষার অভাব ও আবেগের আধিপত্য
বাংলাদেশে রাজনৈতিক আগ্রহ প্রবল হলেও রাজনৈতিক শিক্ষার ঘাটতি মারাত্মক।
স্কুল–কলেজে নাগরিক দায়িত্ব, গণতন্ত্র বা রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই।
ফলে মানুষ রাজনীতিতে অংশ নেয়, কিন্তু রাজনীতির মূল্যবোধ বোঝে না।
ফলাফল—আবেগ ও আনুগত্য প্রাধান্য পায়, যুক্তি ও নৈতিকতা হারিয়ে যায়।
রাজনীতি হয়ে পড়ে জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা, আদর্শের নয়।
রাজনীতি: প্রতিবাদ না আশ্রয়?
বাংলাদেশে রাজনীতি এক দ্বিমুখী বাস্তবতা—এটি যেমন প্রতিবাদের ভাষা, তেমনি আশ্রয়ের প্রতীক।
মানুষ অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রাজনীতি করে, আবার সেই রাজনীতির ছায়াতেও আশ্রয় নেয়।
এই দ্বৈত চরিত্র রাজনীতিকে একদিকে প্রাণবন্ত করে, অন্যদিকে জটিল ও অবিশ্বাস্য করে তোলে।
রাজনীতি মানেই জীবনের প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; এটি জীবনের প্রতিদিনের অনুষঙ্গ।
মানুষ রাজনীতিতে আগ্রহী, কারণ এটি তাদের বেঁচে থাকার, নিরাপত্তা পাওয়ার ও পরিবর্তনের একমাত্র ভরসা।
তবে সেই আগ্রহ যদি কেবল ব্যক্তিস্বার্থে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে রাজনীতি জনগণের মুক্তির হাতিয়ার হতে পারবে না।
প্রয়োজন একটি নৈতিক ও শিক্ষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে রাজনীতি মানে হবে দায়িত্ব, সেবা ও অংশগ্রহণ—লাভ নয়, ন্যায্যতার প্রতীক।
বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতি ভালোবাসে, কারণ রাজনীতি তাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
তবে সেই রাজনীতি যদি জনগণের নয়, কিছু মানুষের স্বার্থে পরিচালিত হয়, তাহলে এই আগ্রহ একদিন ক্ষোভে রূপ নেবে।
রাজনীতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন এটি মানুষের ভাগ্য নয়, ভবিষ্যৎ বদলানোর সাহস জোগাবে।
লেখক–
শিক্ষক ও সাংবাদিক
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর।
sharifsstyle@gmail.com
Leave a Reply