“আমার ৩৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনের উৎসবহীন উৎসব”
বেসরকারি শিক্ষকদের জীবনের নীরব যন্ত্রণা ও অদেখা ত্যাগের গল্প
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
৩৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনের প্রতিটি ঈদ-উৎসব আমার কাছে ছিল এক অভিনয়—লোক দেখানো আনন্দ,ভেতরে শূন্যতা। ঈদ-উল-ফিতর হোক কিংবা ঈদ-উল-আজহা—
আমি হাসি মুখে স্কুলের সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে “ঈদ মোবারক” বিনিময় করলেও হৃদয়ের গভীরে ছিল কষ্টের হাহাকার।
শুধু আমি নই, বাংলাদেশের ছয় লক্ষ বেসরকারি শিক্ষকের জীবনেও এই অভিনয় প্রতিদিনের বাস্তবতা। সামান্য বেতন, উৎসব ভাতার অভাবে আমরা কেউই নিজেদের পরিবারের পছন্দের মানুষ হতে পারিনি।পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান—সবার চোখে একজন অক্ষম মানুষ, ব্যর্থ পিতা, ব্যর্থ স্বামী, ব্যর্থ সন্তান হয়েই থেকেছি।আমার বাব- মা বেঁচে নেই। আমার বাবার আর্থিক অবস্থা মোটেও খারাপ ছিল না।
কিন্তু সন্তান হিসেবে আমি কখনো তাঁর ইচ্ছেমতো কিছু দিতে পারিনি।জানি আমার বাকী জীবন পিতামাতাকে কিছু দিতে না পারার বেদনায় মানুষিক কষ্টে কাটবে।
আমার শিক্ষা যখন আমাকে ব্যর্থ রেখেছে অভিভাবকদের মুখে হাসি ফোটাতে, তখন আমি দাঁড়িয়ে থেকেছি নীরবে,নিজের অপারগতার জ্বালায়।
একজন সেনা সদস্য, পুলিশ কনস্টেবল বা সরকারি অফিসের পিয়ন যে সামান্য বেতনে পিতার চাহিদা পূরণ করতে পারে,সেই একই দেশের উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষক—এমএ, বিএড ডিগ্রিধারী—অভাবের সংসারে দিন কাটান অনিশ্চয়তায়।এ কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষাই সম্মানহীন পেশা!
অর্থনৈতিক দৈন্যতা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়।আমি শিখেছি কীভাবে হাসতে হয় কষ্টের মধ্যেও,শিখেছি কৌশলে উৎসবের অভিনয় করতে,শিখেছি অভাবের ভেতরেও আত্মসম্মান ধরে রাখতে।
স্ত্রীর চোখে লজ্জা দেখেছি, সন্তানদের চোখে প্রত্যাশা—কিন্তু পূরণ করতে পারিনি।তবু জানি না কেন আমার স্ত্রী এখনো আমার পাশে আছে—হয়তো নৈতিক দায়বদ্ধতার টানেই থেকেছে,হয়তো আমায় সত্যিই ভালোবেসেছেন।
এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ফিরে দেখি—বাল্যকালের অর্ধেক কেটেছে পিতার সংসারে,বাকি অর্ধেক কেটে গেল অভাব ও অনটনে।অবসরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়—মানুষের জীবন আসলে কতটুকুই বা বড়!কে বুঝবে,কে শুনবে; একজন শিক্ষকের জীবনের অপূর্ণতার গল্প।একজন শিক্ষক হৃদয়ের হাহাকার ধ্বনি শোনার মানুষের যে বড়ই অভাব এ সমাজে।নির্জন কক্ষে যখন আমি অক্ষর মালা সাঁজাতেছিলাম –কখন যে হৃদয়ের আবেগ উচ্ছলে কপোলযুগলে নয়নাশ্রুে সাগরসম ডেউয়ের বাঁধভাঙ্গা নৃত্য চলছিল টেরই পাইনি।হঠাৎ বুঝলাম — আমি যে আবেগতাড়িত।দেশের প্রতিজন শিক্ষকের অনুভূতি- ই আজ আগুন ছড়াচ্ছে।
তবুও আমি কৃতজ্ঞ—আমি একজন শিক্ষক।আমার শেখানো কোনো শিক্ষার্থী যদি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়,
যদি সে সমাজে আলো ছড়ায়,
তবে আমার সব কষ্ট সার্থক।
আমার জীবনের চরম পাওয়া, পরম প্রাপ্তি—আমার ছাত্রদের সাফল্যেই নিহিত।
লেখক–
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক
(৩৩ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা)
sharifsstyle@gmail.com
Leave a Reply