“জবি শিক্ষার্থীদের নজরুল ভাবনা”
শাহিন ইসলাম, জবি প্রতিনিধি
প্রেম ও দ্রোহের কবি নজরুল তাঁর মানবিকতা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধতা বোধ এবং নারী-পুরুষের সমতার বন্দনা গত প্রায় একশত বছর যাবৎ বাঙালির মানস পীঠ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে।
নিম্নে জবি শিক্ষার্থীদের নজরুল ভাবনা তুলে ধরা হলো-
কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র-প্রভাবিত যুগে কলম তুলে নিলেও, স্বকীয় শিল্প-কৌশলের এক দাবানল জ্বালিয়ে দেন পাঠক-মনে। তিনি শুধু “বিদ্রোহী” কবিতা লিখেছেন বলেই “বিদ্রোহী কবি” হয়ে উঠেছেন তা নয়, চিরাচরিত বিধি-ব্যবস্থায় গা না ভাসিয়ে নিজের পথ গর্বের সাথে নিজেই তৈরি করে বাংলা সাহিত্যে পদার্পণ করেছেন, এজন্যও তিনি বিদ্রোহী। অর্থাৎ তিনি বিদ্রোহী কবি হয়ে উঠার পূর্বে থেকেই একজন আদ্যোপান্ত বিদ্রোহী মানুষ, যে অভাব-অনটন, যাবতীয় যাতনা, লাঞ্ছনা-বঞ্ছনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন সেই শৈশবেই।
কাজী নজরুল ইসলাম কবি হিসেবে কতটা শক্তিশালী তা বলার অপেক্ষা রাখে না, কিন্তু তিনি যে কথাসাহিত্যেও যথেষ্ট শক্তিশালী এবং স্বকীয়তার পরিচয় প্রদান করতে সক্ষম হয়েছেন—তা অবশ্যই যথাযথ মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁর “মৃত্যুক্ষুধা”, “বাঁধন-হারা” ও “কুহেলিকা” উপন্যাসত্রয়, এবং বেশকিছু গল্পসংকলন, বাংলা কথাসাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন।
অপার পাথারের বুকে উন্মত্ত কল্লোল,
বিমল বিরহে আকাশের বুকে উতরোল,
বেশুমার কালো জাহাজের ভেঙেছে মাস্তুল,
উপকূলে ধেয়ে আসা বিধ্বংসী ঘূর্ণি, তুমি নজরুল!
~আরমান হোসেন
বাংলা বিভাগ, ১৮ তম আবর্তন।
কাঠবিড়ালীর পেছনে ছুটে চলা শৈশবে যার ছড়া পড়ে আনন্দে আপ্লুত হতাম,রোজ সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠার প্রেরণা পেতাম তিনি কাজী নজরুল ইসলাম।ছোট থেকে বড় সকলের প্রিয় কবি তিনি।প্রত্যন্ত অঞ্চলের অক্ষরজ্ঞানহীন বৃদ্ধকেও নজরুলসঙ্গীত শুনে অশ্রুসিক্ত হতে দেখেছি।কাজী নজরুল ইসলাম একজন জনসম্পৃক্ত এবং কালোত্তীর্ণ সাহিত্য প্রতিভা।ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি যেমন প্রাসঙ্গিক ছিলেন,আজকের দিনের জুলাই অভ্যুত্থানেও তিনি ঠিক তেমনই প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছেন।জুলাইয়ের গানে-গ্রাফিতিতে আমরা নজরুলকে খুঁজে পাই।নজরুলকে সকলে বিদ্রোহী কবি হিসেবে জানলেও প্রেমিক কবি হিসেবে জানে খুব কম মানুষই।অথচ তিনি যতটা বিদ্রোহের কবি,ঠিক ততটাই প্রেমের কবি।তাঁর এক হাতে ছিল ‘বাঁশের বাঁশরী’,আরেক হাতে ‘রণ-তূর্য্য’।তিনি আজীবন মানবপ্রেমের কথা বলেছেন,সাম্যের কথা বলেছেন।যেখানেই অসাম্য আর অনিয়ম সেখানেই উচ্চারিত হয়েছে তাঁর বিদ্রোহের পঙ্ক্তিমালা।জালিমের জন্য তিনি ছিলেন বজ্রকঠিন আর মজলুমের জন্য কুসুমকোমল।মানুষ পরিচয়ই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়_একথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন নজরুল।বিশ্বাস করতেন বলেই যে হাতে তিনি ইসলামি গান লিখেছেন,সে হাতেই লিখতে পেরেছেন শ্যামাসঙ্গীত।কবিতা ও গানের পাশাপাশি গল্প,উপন্যাস,নাটকেও নজরুল তাঁর নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন।কাজী নজরুল ইসলাম রয়ে যাবেন তাঁর সাহিত্যকর্মে,ছড়িয়ে পড়বেন বিশ্বময়,বেঁচে থাকবেন নজরুলপ্রেমীদের হৃদয়ের মণিকোঠায়।
আসাদুজ্জামান, বাংলা বিভাগ,
১৮ তম আবর্তন।
”নজরুল” নামটি শোনামাত্রই আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠে অন্যায়ের আঁধার ভেদ করা কোনো অগ্নিশিখার মতো উজ্জ্বল একজন প্রতিভাবান ব্যক্তির মুখচ্ছবি, তিনি আর কেউ নন, আমাদের জাতীয় কবি এবং আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যদিও তিনি একইসাথে কথাসাহিত্যিক নজরুল, কবি নজরুল, নাট্যকার নজরুল, প্রবন্ধকার নজরুল এবং সঙ্গীতজ্ঞ নজরুল, তবে তাঁদের মধ্যে কবি নজরুলই প্রথম আমার মনে কড়া নাড়িয়েছেন। পারিবারিক অভাব- অনটনের মধ্যে থেকেও জীবন নিয়ে তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা বিশেষভাবে প্রসংশনীয়। তাঁর “সংকল্প” কবিতার “থাকবো না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে” লাইনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে কত কত প্রাণ এখনো যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে ঘুরে বেড়াচ্ছে জগৎটাকে দেখার জন্য। ছোটবেলায় পড়েছিলাম তাঁর রচিত আমাদের রণ সংগীত “চল চল চল” কবিতাটি। যদিও ছন্দের তালে মুখস্থ করেছিলাম তবে এর মর্মার্থ কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। এখন উপলব্ধি করতে পারছি যে, এতটুকু বাচ্চার জন্য এই কবিতার গভীর অর্থ অনুধাবন করা ছিল সত্যিই দুষ্কর। তাঁর নাম শুনে হয়তো আমার মতো সবার মনেই উদয় হয় সেই বিখ্যাত কবিতা “বিদ্রোহী”র কথা, যার জন্য তিনি পরিচিত হয়ে আছেন “বিদ্রোহী কবি” হিসেবে। তিনি সর্বদাই লড়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, উড়িয়েছেন সত্যের নিশানা, কথা বলেছেন সাম্যের এবং দূর করেছেন সাম্প্রদায়িকতা। তাঁর কবিতার প্রেম ও বিদ্রোহী চেতনা, সত্য ও ন্যায়ের জয়জয়কার আকৃষ্ট করেছে আমার মতো হাজারো পাঠককে, করে তুলেছে নজরুলপ্রেমী। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ শে আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন, যদিও মৃত্যু হয় নি তাঁর। নক্ষত্রের আলোর মত তাঁর আভা আলোকিত করছে পাঠক হৃদয়কে। তাঁকে অল্প অল্প করে যতই বুঝতে পারছি ততই অভিভূত হচ্ছি। তাঁর সম্পর্কে এটাই শুধু বলার-
হে প্রিয় কবি,
আপনার প্রতিভার নেই কোনো শেষ,
আপনার প্রতি শ্রদ্ধা অবিরাম, ভালোবাসা অনিঃশেষ।
রিয়া রাণী শীল
বাংলা বিভাগ
১৯ তম আবর্তন।
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, ছোটদের কবি। তিনি ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ইংরেজি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আমার কাছে নজরুলের শিশুতোষ কবিতা, গল্প ও গানগুলো সবচেয়ে আপন। শৈশবের উচ্ছ্বাস, সরলতা ও নিষ্পাপ দুষ্টুমিকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা অনন্য। যেমন তাঁর ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’ কবিতায় কাঠবিড়ালীর সাথে খুকির অভিমান যেন শিশুমনের খেলা আর প্রকৃতির সাথে তার মেলবন্ধনকেই প্রকাশ করে। আবার ‘লিচু চোর’ কবিতাটি গ্রামবাংলার শিশু কিশোরদের গাছ থেকে ফল চুরি করার চিরায়ত রূপকে তুলে ধরে। এই কবিতায় গ্রামবাংলার চঞ্চল শিশুমন আর দুষ্টামির হাস্যরস পাঠককে মুগ্ধ করে। ছোটদের জন্য তিনি বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থ এবং একটি নাটক রচনা করেন। তন্মধ্যে ঝিঙে ফুল, পুতুলের বিয়ে, ঝড় এবং পিলে পটকা, পুতুলের বিয়ে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছোট-বড় সবার প্রিয় কবি। সবার জন্যই লিখেছেন। ছোটদের মেধা ও মনন উপযোগী মজার মজার অনেক লেখায় সমৃদ্ধ করেছেন শিশুসাহিত্যকে। শিশুদের ভেতরের সুপ্ত ইচ্ছা ও কল্পনার জগতকে জাগিয়ে তুলেছেন কবি নজরুল।তাঁর রচিত সংকল্প, ঝিঙেফুল, আমি হবো এই কবিতাগুলো আমাদের শৈশবকে রাঙিয়ে দিয়েছিল। বাংলা সাহিত্যে তিনি আর একটি নতুন ধারা যুক্ত করেছিলেন তা হলো ইসলামিক গান বা গজল। এসবের পাশাপাশি তিনি প্রচুর গান ও রচনা করেছেন যা আজও সকলের কাছে সমাদৃত। নজরুল আমাদের কাছে শুধু কবি নন, তিনি আমাদের সাহিত্য – সংস্কৃতির এক চিরন্তন প্রেরণা।আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর এই অনুপ্রেরণা, সাহস, শক্তি ও ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে।
রাবেয়া আক্তার রিতু
দর্শন বিভাগ, ১৯ তম আবর্তন।
কাজী নজরুল ইসলাম সেই মহান মানুষকে যিনি শব্দের শক্তি দিয়ে বাংলার সাহিত্য, সংগীত এবং সমাজচেতনার ইতিহাস গঠন করেছেন। তার জীবন ছিল এক অবিচল বিপ্লব, যেখানে তিনি স্বাধীনতা, ন্যায় এবং মানবাধিকারের জন্য লড়েছেন, যেখানে তিনি অমানবিক অবিচার, নিপীড়ন এবং দাসত্বের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন কণ্ঠ তুলেছেন। নজরুলের কবিতা, গান এবং প্রবন্ধ আমাদের শেখায় যে সাহস, প্রেম এবং মানবিক চেতনা কখনো নীরব থাকে না, বরং প্রত্যেক হৃদয়ে জীবন্ত থাকে।
তিনি আমাদের দেখিয়েছেন কিভাবে প্রতিটি শব্দ হতে পারে এক শক্তিশালী অস্ত্র, কিভাবে সঙ্গীতের মাধ্যমে মানুষকে জাগ্রত করা যায়, কিভাবে চেতনার আলো দিয়ে অন্ধকার দূর করা যায়। তার শিল্পকর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা শুধু রাজনীতির নয়, মননেরও, সংস্কৃতিরও এবং চেতনারও।
আজ, তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা শুধু তাকে স্মরণ করি না, আমরা প্রতিজ্ঞা করি তার আদর্শকে জীবন্ত রাখব। আমরা প্রতিটি সাহসী পদক্ষেপে, প্রতিটি সঠিক কাজে, প্রতিটি মানবিক সিদ্ধান্তে তার চেতনা বাঁচিয়ে রাখব। আমরা জানি যে তার সৃষ্টিশীল শক্তি আজও আমাদের পথপ্রদর্শক, তার বিপ্লবী শব্দ আজও আমাদের হৃদয় জাগ্রত করে। নজরুল আমাদের শেখিয়েছেন যে মানুষের জন্য ভালোবাসা এবং মানুষের জন্য লড়াই কখনো শেষ হয় না, এবং এই শিক্ষা আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিফলিত হবে।
সৌরভ ইসলাম
বাংলা বিভাগ ১৯ তম আবর্তন।
মহাজাগতিক ধূমকেতুর ন্যায় বাংলা সাহিত্যের অন্তরিক্ষে যে ধূমকেতুর আবির্ভাব হয়েছিলো তাঁর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। প্রতিটি বাঙালির সাথে তাঁর এক নিবিড় সম্পর্ক। শৈশবে তাঁর কবিতা পড়েননি অথবা “চল্ চল্ চল্” এর রণ দামামা ও মাদলের তালে তালে ঊষার দুয়ারে আঘাত হেনে রাঙা প্রভাতের স্বপ্ন দেখেননি এমন কিশোর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই রোমাঞ্চকর স্বপ্নের যিনি সারথি তাঁর জীবনও কম রোমাঞ্চকর নয়। বোহিমিয়ান স্বভাব,আপসহীন মনোভাব,দুর্বার গতির প্রবল উচ্ছ্বাসে আর সৃষ্টিসুখের উল্লাসে বাংলা সাহিত্যে তিনি সৃজন করেন এক নবযুগের। তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রনাথ শুনতে পেয়েছিলেন অসির ঝনঝনা, অসির সেই ঝনঝনাতেই কম্পিত হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক শাসকের মসনদ। নজরুলের জীবনে বহুবার নেমে আসে অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ; তবুও কবি গেয়েছেন সত্য, চিত্ত আর নিত্যের জয়গান। কারণ তিনি মানুষের কবি,মানবতার কবি, সাম্যের কবি, উদারতার কবি, জীবনের কবি।
ঔপনিবেশিক শাসকেরা নিজেদের হীন স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে যোজন যোজন দূরত্ব সৃষ্টি করে, নজরুল সেই দূরত্ব লাঘবে করেন সম্প্রীতির যোজনা।
লক্ষণীয় বিদ্রোহী কবিতায় দ্রোহী নজরুল একে একে হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও মুসলিম ঐতিহ্যকে সমন্বয় করে এক প্রচণ্ড বজ্রাঘাত করেন শাসকের লৌহকপাটে। আত্মভোলা ও বিস্তৃত বাঙালিকে স্মরণ করিয়ে দেন স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্য ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
আজীবন তিনি তাঁর কবিতা,গান,প্রবন্ধে সম্প্রীতির কথা বলেছেন, বলেছেন সমাজের অসহায়, নিপীড়িত,শোষিত,সর্বহারার কথা।
নজরুল কেবল যুগন্ধর বা যুগপ্রবর্তক
কবিই নন। তিনি সকল কালের কবি। সমকালের কবি। তাঁর কবিতা,গান যেরূপ ব্রিটিশরাজের পাষাণ বেদিতে ধ্বংসের নিশান উড়িয়েছে, ঠিক সেভাবেই আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে সকল জাতীয় সংকটে, উত্তরণের জন্য দেখিয়েছে পথ, জুগিয়েছে সাহস৷ তাই
তিনি সবকালে সকলসময় সমভাবে আমাদের নিকট প্রাসঙ্গিক এবং সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে আমাদের মাঝে উপস্থিত।
মোহাম্মদ আতেফ আসাদ পিদিম
বাংলা বিভাগ, ১৮ তম আবর্তন।
Leave a Reply